
মোদির বিরুদ্ধে পথে ভারতের ক্ষুব্ধ তরুণেরা
ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লির রাজপথে পুলিশের ব্যারিকেড, ধরপাকড় আর তরুণদের প্রতিবাদ—সব মিলিয়ে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে দেশটির রাজনৈতিক পরিস্থিতি। ভোটার তালিকা থেকে কোটি কোটি নাম বাদ দেওয়ার ঘটনায় ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে তরুণদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, এই পদক্ষেপের ফলে অনেক যোগ্য নাগরিক ভোটাধিকার হারাতে পারেন এবং এতে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির দল বিজেপি রাজনৈতিক সুবিধা পেতে পারে।গত শনিবার (১০ অক্টোবর) প্রতিবাদে অংশ নিতে নয়াদিল্লিতে যান ২২ বছর বয়সী অর্থনীতির শিক্ষার্থী কাশিশ রাওয়াত। পরিবারের সদস্যদেরও তিনি যাওয়ার কথা জানাননি। রাজধানীতে পৌঁছে তিনি দেখেন, বিভিন্ন সড়কে ব্যারিকেড বসানো হয়েছে। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের সরিয়ে দিতে গিয়ে কাউকে মারধর করছে, কাউকে টেনেহিঁচড়ে বাসে তুলছে। অনেকে পুলিশের হাত থেকে বাঁচতে ছুটে পালাচ্ছেন। বিক্ষোভকারীদের ধারণ করা এসব দৃশ্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।তবে পুলিশের কঠোর অবস্থানেও দমে যাননি কাশিশ। সন্ধ্যা পর্যন্ত রাস্তায় থেকে তিনি বলেন, তারা প্রতিবাদ বন্ধ করবেন না, আবারও ফিরে এসে নিজেদের দাবি জানাবেন।ভারতে গত বছর থেকে ভোটার তালিকা ব্যাপকভাবে পর্যালোচনার কাজ চলছে। এ প্রক্রিয়ায় ইতোমধ্যে ১৩ কোটির বেশি নাম বাদ পড়েছে। নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, তালিকা থেকে একাধিকবার থাকা নাম এবং ভোট দেওয়ার যোগ্য নন—এমন ব্যক্তিদের নাম বাদ দিতেই এই উদ্যোগ।তবে সমালোচকদের অভিযোগ, তালিকা সংশোধনের নামে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ভোটারদের বাদ দেওয়া হচ্ছে। এতে লাখো বা আরও বেশি যোগ্য নাগরিক ভোটাধিকার হারাতে পারেন। তাদের আশঙ্কা, এই প্রক্রিয়া মোদির দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে সুবিধা দিতে পারে।এ নিয়ে প্রতিবাদে নেতৃত্ব দিচ্ছে তরুণদের সংগঠন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’। আন্দোলনকারীরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার গনেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করছেন। তাদের মতে, ভোট দেওয়ার অধিকার গণতন্ত্রের অন্যতম ভিত্তি। সেই অধিকার নিশ্চিত করতে হলে ভোটার তালিকা সংশোধনের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ হতে হবে।অন্যদিকে, নির্বাচন কমিশনের দাবি, ভোটার তালিকার নির্ভুলতা নিশ্চিত করতেই এই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী মোদি প্রকাশ্যে এ প্রতিবাদ নিয়ে কোনো মন্তব্য করেননি। তার দলের কয়েকজন নেতা বিক্ষোভকারীদের নৈরাজ্যবাদী বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং প্রমাণ ছাড়াই তাদের পেছনে বিদেশি শক্তির মদদ থাকার অভিযোগ তুলেছেন।নরেন্দ্র মোদি এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতের প্রধানমন্ত্রী। তার শাসনামলে দেশটির গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর স্বাধীনতা, ভিন্নমত প্রকাশের সুযোগ এবং সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতা নিয়ে বিভিন্ন মহল উদ্বেগ জানিয়েছে। সমালোচকদের অভিযোগ, সরকার নির্বাহী ক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণ কমিয়ে দিচ্ছে এবং ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের, বিশেষ করে মুসলিমদের, লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে।তবে সরকার এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, দেশটির প্রতিষ্ঠানগুলো শক্তিশালী এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আইন ভঙ্গের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়, ভিন্নমতের বিরুদ্ধে নয়।কিন্তু অনেক তরুণের কাছে পরিস্থিতি ভিন্ন। তাদের ধারণা, সরকারের সমালোচনা করলেই বাধা, হয়রানি কিংবা গ্রেপ্তারের মুখে পড়তে হতে পারে। ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক সেই অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘদিনের হতাশা এখন একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদে রূপ নিচ্ছে।এর আগে চলতি বছরের গ্রীষ্মে তরুণদের আন্দোলনের চাপে মোদির শিক্ষামন্ত্রী পদত্যাগ করেছিলেন। সেই ঘটনা বিক্ষোভকারীদের মনে নতুন আশা জাগায়—রাজপথে প্রতিবাদ করেও রাজনৈতিক সিদ্ধান্তে পরিবর্তন আনা সম্ভব।১৯ বছর বয়সী সমাজবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী মায়া রিবেইরোও ভোটার তালিকা নিয়ে উদ্বিগ্ন। তার সঙ্গে শনিবারের (১০ অক্টোবর) প্রতিবাদে অংশ নেন দুই বন্ধু। মায়া জানান, তারা (১০ অক্টোবর) ভোটার হিসেবে নিবন্ধন করেছিলেন, কারণ গণতন্ত্রে অংশ নেওয়াকে তারা অধিকার ও দায়িত্ব—দুটিই মনে করেন।কিন্তু তালিকা থেকে আরও নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা তাদের মনে প্রশ্ন তৈরি করেছে—ভোট দেওয়ার অধিকার কি সত্যিই সবার জন্য নিশ্চিত?মায়ার মতে, ভোট দেওয়ার প্রতিষ্ঠানটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেটিকে স্বচ্ছ ও নির্ভরযোগ্য রাখা প্রয়োজন। বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে বিতর্ক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মতবিনিময়ের মধ্য দিয়ে তরুণদের ব্যক্তিগত ক্ষোভ এখন সম্মিলিত প্রতিবাদে রূপ নিচ্ছে।তাদের ভাষ্য, দীর্ঘদিন নিজেদের অসহায় মনে হলেও আন্দোলনে অংশ নিয়ে তারা নতুন করে রাজনৈতিকভাবে সক্রিয় হওয়ার শক্তি খুঁজে পেয়েছেন।প্রতিবাদ ঠেকাতে পুলিশের ব্যাপক তৎপরতা তরুণদের ক্ষোভ আরও বাড়িয়েছে। তাদের মতে, গণতান্ত্রিক দেশে শান্তিপূর্ণভাবে সমবেত হওয়ার অধিকার থাকা সত্ত্বেও তাদের সঙ্গে যে আচরণ করা হয়েছে, তা অযৌক্তিক।২১ বছর বয়সী দর্শনের শিক্ষার্থী আরিয়ান কাজানিয়া মনে করেন, ভোটার তালিকা নিয়ে বিরোধ আসলে ভারতের রাজনৈতিক ব্যবস্থার প্রতি তরুণদের বৃহত্তর হতাশারই প্রতিফলন। তার প্রশ্ন, যখন কর্তৃপক্ষ যেকোনো সময় সমাবেশে বাধা দিতে পারে বা বিক্ষোভকারীদের আটক করতে পারে, তখন তারা নিজেদের মতপ্রকাশের অধিকার কীভাবে প্রয়োগ করবেন?আরিয়ানের ভাষ্য, রাজধানীতে কী ঘটছে, তা জানতে বিভিন্ন শহরের মানুষ চেষ্টা করছেন এবং আন্দোলনে যোগ দিচ্ছেন। কিন্তু একই সময়ে তাঁদের কণ্ঠ স্তব্ধ করে দেওয়ার চেষ্টাও চলছে।এই আন্দোলনের অংশ নেওয়া সবাই কোনো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দল বা সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত নন। অনেকেই জানিয়েছেন, ভোটাধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন তাদের এক জায়গায় নিয়ে এসেছে।মোদির বিরুদ্ধে দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ গড়ে তোলা সহজ নয়। এক দশকেরও বেশি সময় ধরে তিনি ভারতের রাজনীতিতে প্রভাবশালী অবস্থানে রয়েছেন। তার দল ভারতীয় জনতা পার্টির রয়েছে শক্তিশালী নির্বাচনী সংগঠন। অন্যদিকে, বিরোধী দলগুলো অতীতের অসন্তোষকে স্থায়ী জাতীয় আন্দোলনে রূপ দিতে হিমশিম খেয়েছে।তরুণদের বর্তমান আন্দোলনও এখনো সুসংগঠিত বিকল্প রাজনৈতিক শক্তি হয়ে উঠতে পারেনি। তবে সরকারের সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রকাশ্যে প্রশ্ন তোলার সুযোগ তৈরি করাকেও তারা গুরুত্বপূর্ণ লড়াই হিসেবে দেখছেন।কাশিশ রাওয়াতের পরিবারেও রাজনীতি নিয়ে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে। তার ধারণা, পরিবারের সদস্যদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গিতে মোদির দলের প্রতি সহানুভূতিশীল টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমের প্রভাব রয়েছে। মতের অমিলের কারণে কখনো কখনো আত্মীয়দের সঙ্গে কথাবার্তাও বন্ধ হয়ে গেছে বলে জানান তিনি। তবু তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছেন কাশিশ।মায়া রিবেইরোর কাছে এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, তরুণেরা নিজেদের ক্ষোভকে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির দাবিতে দীর্ঘস্থায়ী আন্দোলনে রূপ দিতে পারবেন কি না।তার বিশ্বাস, সাম্প্রতিক প্রতিবাদ তরুণদের মনে গণতন্ত্রের প্রতি নতুন করে আস্থা তৈরি করেছে। এখন দেখার বিষয়, রাজপথের এই ক্ষোভ কতটা স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তন আনতে পারে এবং ভারতের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ভোটাধিকার নিয়ে তৈরি হওয়া উদ্বেগের সমাধান কীভাবে হয়।সূত্র: এপি