পরিকল্পনা ও উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে ক্রমাগত আপোষে ঢাকার বাসযোগ্যতা ফিরবে না: আইপিডি
11 জুলাই 2026, বিকাল 3:40
ত্রুটিপূর্ণ উন্নয়ন দর্শন, স্বার্থান্বেষী মহলের চাপে পরিকল্পনায় ক্রমাগত অন্যায্য আপোষ, উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণে সরকারী সংস্থাসমূহের ব্যর্থতা, আইনের প্রয়োগে সরকারী সংস্থাসমুহের অনীহা এবং জনবান্ধব নগর ব্যবস্থাপনার অনুপস্থিতির কারণে বিপুল পরিমাণ বিনিয়োগের পরও ঢাকাকে বাসযোগ্য করা যাচ্ছে না বলে মনে করে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং এন্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। ঢাকা মহানগরীর পরিকল্পনার ক্রমাগত সংশোধন ও কাঁটাছেড়া, হাজার হাজার কোটি টাকার বাজেট বিনিয়োগ এবং দৃশ্যমান বড় বড় উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়ন করার পরও বৈশ্বিক বাসযোগ্যতা সূচকে ঢাকার অবস্থান আবারও তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে। লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ইকোনমিস্ট ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (ইআইইউ) এর প্রকাশিত ‘গ্লোবাল লিভেবিলিটি ইনডেক্স’ এ ১৭৩টি শহরের মধ্যে ঢাকার অবস্থান ১৭১তম। দেশের জিডিপি ও অর্থনীতির মূল কেন্দ্রে থাকা রাজধানী শহর ঢাকার বাসযোগ্যতার ক্রমাবনতির বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগের বলে মনে করে আইপিডি। একইসাথে এই অবস্থার পেছনে দায়ীদের চিহ্নিত করবার পেছনে সরকারের নির্লিপ্ততা ও উদাসীনতা শহরের ভবিষ্যতকে আরও ঝুঁকিতে ফেলেছে বলে মনে করে আইপিডি।বিগত বছরগুলোতে ঢাকার যোগাযোগ ও অবকাঠামো খাতে ফ্লাইওভার, এক্সপ্রেসওয়েসহ অসংখ্য বড় বড় প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। কিন্তু এই সমস্ত বিনিয়োগের সিংহভাগই ছিল অবকাঠামোসর্বস্ব, যা সাধারণ নগরবাসীর প্রতিদিনের যাতায়াত, পরিবেশ বা জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদী ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে ব্যর্থ হয়েছে। বিনিয়োগ ও পরিকল্পনার পরও ঢাকার বাসযোগ্যতার উত্তরণ না হবার পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে বলে মনে করে আইপিডি ।• পরিকল্পনায় ক্রমাগত আপোষ ও গোষ্ঠী স্বার্থে বারংবার সংশোধন: রাজধানী ঢাকাকে বাঁচাতে ঢাকার স্ট্রাকচার প্ল্যান বা কৌশলগত পরিকল্পনা এবং বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এর প্রস্তাবিত পরিকল্পনা, নীতি ও কৌশলকে যথাযথ বাস্তবায়ন না করে প্রভাবশালীদের চাপে বারবার সেখানে আপোষ করা হয়েছে। ২০২২ সালে সর্বশেষ ড্যাপ প্রণয়ন এর তিন বছরের মাথায় আবাসন ব্যবসায়ীদের চাপে দুইবার ড্যাপ সংশোধন করা হয়েছে। বর্তমান সরকারকে আবাসন ব্যবসায়ীরা সম্প্রতি আবার ফার বাড়ানোর জন্য ড্যাপ পুনরায় সংশোধন এর জন্য ইতিমধ্যে চাপ দিচ্ছে। বিস্ময়কর হলো পরিকল্পনাবিদদের সতর্কবার্তা উপেক্ষা করে গোষ্ঠী স্বার্থে এই পরিবর্তনসমূহ ঢাকার বাসযোগ্যতা ধ্বংসের অন্যতম প্রধান কারণ। জলাশয়-জলাধার-জলাভূমি রক্ষা, সবুজ এলাকা সংরক্ষণ এবং জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণের মতো অতি প্রয়োজনীয় পরিকল্পনাগুলো স্বার্থান্বেষী মহলের ব্যবসায়িক মুনাফার স্বার্থে সংশোধন ও কাটছাঁট করে পুরো পরিকল্পনার মূল চেতনাকেই ধ্বংস করা হয়েছে। • ভুল উন্নয়ন দর্শন এবং সমন্বয়হীন অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প: ঢাকা শহরের বাসযোগ্যতার ক্রমাবনতির পেছনে ভুল উন্নয়ন দর্শন, সমন্বয়হীন অবকাঠামো ও উন্নয়ন প্রকল্প, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে সরকারের ধারাবাহিক ব্যর্থতার দায় রয়েছে বলে মনে করে আইপিডি। শহরের প্রকৃত টেকসই উন্নয়ন এবং বাসযোগ্যতা বৃদ্ধির জন্য প্রয়োজন মানসম্মত আবাসন এলাকা তৈরি, নাগরিক সুবিধাদির সার্বজনীন অধিকার নিশ্চিত করা, পরিবেশ সুরক্ষা, গণপরিবহন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন, এবং হাঁটার পরিবেশ নিশ্চিত করা দরকার ছিল। অথচ আমাদের উন্নয়ন ভাবনা কেবল কংক্রিটের বড় বড় অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বিভিন্ন সেবা সংস্থার মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে এই প্রকল্পগুলো উল্টো জনগণের দুর্ভোগ ও পরিবেশ দূষণ বাড়িয়েছে। • উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণে চরম ব্যর্থতা: ঢাকা মহানগরীতে একের পর উন্নয়ন ও অবকাঠামো প্রকল্প নেওয়া হলেও ঢাকা শহরের ডেভেলপমেন্ট কন্ট্রোল বা উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এর কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অমান্য করে জলাভূমি ভরাট, উন্মুক্ত স্থান দখল এবং যত্রতত্র বহুতল ভবন নির্মাণ চললেও নিয়ন্ত্রক সংস্থা রাজউক, সিটি কর্পোরেশনসহ নগর সংস্থাসমুহের নীরব ভূমিকার তেমন কোন পরিবর্তন নেই। • ওয়ার্ডভিত্তিক সমস্যা চিহ্নিতকরণ ও বিকেন্দ্রীকৃত পরিকল্পনার অভাব: ঢাকা শহরের একেকটি এলাকা তথা ওয়ার্ড এর বৈশিষ্ট্য, জনঘনত্ব এবং নাগরিক সংকট সম্পূর্ণ ভিন্ন। অথচ আমাদের নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়ন প্রকল্পগুলো এখনও উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়া বা টপ-ডাউন প্রকৃতির। স্থানীয় পর্যায়ে—অর্থাৎ প্রতিটি ওয়ার্ডের পানি সরবরাহ, ড্রেনেজ ব্যবস্থা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, ফুটপাত, পার্ক ও খেলার মাঠের সুনির্দিষ্ট চাহিদা ও সংকটগুলোকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ম্যাপ বা চিহ্নিত করে কার্যকর স্থানীয় কর্মপরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে না।• জনসংখ্যা ও জনঘনত্ব নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা:ঢাকা শহরের ধারণক্ষমতা ইতিমধ্যে তার সীমা অতিক্রম করেছে। মেগা প্রকল্প বা বড় বড় অবকাঠামো তৈরি করেও ঢাকার বাসযোগ্যতা ফেরানো সম্ভব হচ্ছে না, কারণ এর মূল মূলে রয়েছে অনিয়ন্ত্রিত জনসংখ্যা, অতি-জনঘনত্ব এবং উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার চরম ব্যর্থতা। ঢাকার বর্তমান জনঘনত্ব পৃথিবীর অন্যতম সর্বোচ্চ, যা নাগরিক সুবিধাদি ও পরিষেবার ওপর প্রচন্ড চাপ সৃষ্টি করছে। ফলে উন্নয়ন এর বিকেন্দ্রীকরণ এর মাধ্যমে ঢাকার ওপর জনসংখ্যার চাপ কমাতে না পারলে কোনো পরিকল্পনাই সফল হবে না।• আবাসন খাতের কাঠামোগত বৈষম্য ও নিম্ন আয়ের মানুষের আবাসন সংকট: ঢাকার বিশদ অঞ্চল পরিকল্পনা (ড্যাপ) এবং জাতীয় নগর উন্নয়ন নীতিতে সকল শ্রেণীর মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক আবাসনের সুস্পষ্ট নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও, ঢাকার আবাসন খাত সম্পূর্ণভাবে উচ্চ ও উচ্চ-মধ্যবিত্ত শ্রেণীর বাণিজ্যিক স্বার্থে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। ঢাকার কর্মক্ষম জনসংখ্যার সিংহভাগ তথা পোশাক শ্রমিক, দিনমজুর, রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের মানুষদের জন্য সাশ্রয়ী আবাসন নিশ্চিতে রাষ্ট্রীয় বা বেসরকারি পর্যায়ে তেমন কোনো কার্যকর উদ্যোগ নেই। পরিকল্পনায় ক্রমাগত আপোষের কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও মানবিক বিপর্যয়কর বস্তি বা অনানুষ্ঠানিক বসতিতে তুলনামূলক বেশি ভাড়ায় বাস করতে বাধ্য হচ্ছেন।