
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
একদিন যে নদীর জোয়ার-ভাটার বিস্ময়কর রুপ মুগ্ধ করেছিল মুঘলদের। বুড়িগঙ্গার এই ছন্দ দেখেই ১৬১০ সালে মুঘল সুবাদার ইসলাম খান রাজধানী রাজমহল থেকে ঢাকায় স্থানান্তর করেন। সময়ের পরিক্রমায় সেই বুড়িগঙ্গাই আজ নগরীর অবহেলা, বর্জ্য ও অপরিকল্পিত নগর সম্প্রসারণের ভারে অস্তিত্ব সংকটে। লঞ্চ, স্টিমার, ট্রলারসহ অসংখ্য নেীযানের ব্যস্ততায় নদীর বুক এখনো সরব; কিন্তু তার স্রোতের সঙ্গে মিশে আছে দুষিত পানি, বর্জ্য আর দীর্ঘদিনের নগরব্যবস্থাপনার সংকট। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর আলোচনা সাধারনত নদী সংস্কার, দখলমুক্তকরণ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়- শুধু নদী ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন কি অস্তিত্ব সংকটে থাকা এ নদীকে বাঁচাতে পারবে, নাকি পাশাপাশি নজর দিতে হবে পুরো নগর কাঠামোর দিকে?
ঢাকার ইতিহাসের সঙ্গে বুড়িগঙ্গার সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। নদীকে ঘিরেই গড়ে উঠেছে জনবসতি, বানিজ্য ও যোগাযোগের নানা কাঠামো। সদরঘাট আজও তার জীবন্ত প্রমান। প্রতিদিন হাজারো মানুষ নদীপথে যাতায়ত করেন, পন্য ওঠানামা করে, নেীযান ছুটে চলে এক ঘাট থেকে আরেক ঘাটে। মুঘল আমলে ঢাকার গুরুত্ব বাড়ার সাথে সাথে বুড়িগঙ্গাও হয়ে ওঠে নগরজীবনের অন্যতম প্রধান অবলম্বন। আজও সদরঘাটের ব্যস্ততা সেই ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করে। লঞ্চ, স্টিমার, ট্রলার, নেীকাসহ নানা ধরনের নেীযানের অবিরাম চলাচলে নদীর বুকজুড়ে তৈরী হয় এক ব্যস্ত পরিবেশ। এই নদীকে ঘিরেই কত কত জীবিকা- কেউ নাবিক, কেউ মাঝি, কেউ শ্রমিক, আবার কেউ ঘাট ও নেী-বানিজ্যের সঙ্গে যুক্ত। কিন্তু যে নদী একসময় নগরকে সমৃদ্ধির পথ দেখিয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় সেই নদীকেই আজ শহরের বর্জ্য ও অবহেলার ভার বহন করতে হচ্ছে।
বাবুবাজার ব্রীজ-সদরঘাট-পোস্তগোলা পর্যন্ত নদীর পার ঘুরলে চোখে পড়বে দূষনের নানা চিত্র। কোথাও পানির ওপর ভাসছে পলিথিন ও প্লাস্টিকের বোতল, কোথাও জমে আছে আবর্জনা। কোথাও আবার নদীর তীরে বর্জ্যের স্তূপ। নদীর পানির স্বাভাবিক রং অনেক জায়গাতেই বদলে গেছে। বাতাসে ভেসে আসে দূর্গন্ধ। নেীকা চলাচল করছে, ঘাটে মানুষের ব্যস্ততা রয়েছে- কিন্তু নদীর পানির দিকে তাকালে সেই ব্যস্ততার আড়ালে লুকিয়ে থাকা সংকট স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই দৃশ্য শুধু একটি নদী দূষিত হয়ে যাওয়ার গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি শহরের বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পয়ঃনিষ্কাশন, শিল্পায়ন এবং অপরিকল্পিত নগরায়নের দীর্ঘদিনের সংকট। প্রায় তিন দশক ধরে এ নদীর সঙ্গে জীবনযাপন গনি মিঞাঁর (৫৭)। বর্তমানে তিনি সদরঘাট থেকে কামরাঙ্গীরচর মাতবর ঘাটে ট্রলার চালান। তিনি বলেন, “ যহন পানি কইমা যায়, এমন গন্ধ হইয়া যায় যে সারাদিন গন্ধে থাইকা বাড়িতে গিয়াও খাইতে পারি না।“
বুড়িগঙ্গার দূষনের পেছনে একক কোন কারন নেই। বিভিন্ন গবেষনায় শিল্পবর্জ্য, পেীরবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য এবং বিভিন্ন নিষ্কাশন পথ দিয়ে নদীতে প্রবেশ করা দূষিত পানিকে গুরুত্বপূর্ন উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। দীর্ঘদিন থেকে হাজারীবাগের ট্যানারি শিল্পও বুড়িগঙ্গা দূষনের অন্যতম কারন হিসেবে আলোচিত ছিল। গবেষণায় ট্যানারি বর্জ্যে ক্রোমিয়ামসহ বিভিন্ন ধাতুর উপস্থিতি এবং এর পরিবেশগত প্রভাবের কথা উঠে এসেছে। তবে ট্যানারি শিল্প সরিয়ে নেওয়ার পরেও বুড়িগঙ্গার সংকট শেষ হয়নি।কারন এটি ছিল দূষনের অনেক কারনের মধ্যে একটি মাত্র।
এছাড়াও পুরান ঢাকার মতো ছোট জায়গায় বিশাল জনগোষ্ঠির চাপ যথাযথ ব্যবস্থাপনায় এনে বুড়িগঙ্গাকে দূষন মুক্ত করাও প্রায় অসম্ভব। যা সবকিছুকে ঢাকাতে কেন্দ্রীকরনের বিষয়টাকেও দূষনের অন্যতম কারন হিসেবে চিহ্নিত করে। মাঝি আব্দুল আজিজের (৫২) অভিজ্ঞতাও বিষয়টি নতুনভাবে ভাবার সুযোগ দেয়। তাঁর ভাষায়, “বুড়িগঙ্গার পানিতে এহন সাকার মাছ ছাড়া আর কোন মাছ থাহে না। তয় করোনার সময় যহন মানুষজন গেরামগঞ্জে চইলা গেছিল, তহন কয়েক মাসেই পানি পরিষ্কার হইয়া গেছিল, নানান ধরনের ছোট-বড় মাছও চইলা আইছিল নদীতে।“
বুড়িগঙ্গার দূষণ শুধু চোখে দেখা কালচে পানি কিংবা দুর্গন্ধের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বিভিন্ন গবেষণায় নদীটির পানির গভীর সংকটের চিত্রও উঠে এসেছে। ২০২৩ সালে Journal of water & Health- এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ২০১৯-২০২০ সময়ে বুড়িগঙ্গার দশটি স্থান থেকে সংগ্রহ করা ২১০ টি পানির নমুনা বিশ্লেষন করা হয়। এতে ক্রোমিয়াম, নিকেল, সীসা ও ক্যাডমিয়ামসহ একাধিক ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়। গবেষণাটিতে ক্যাডমিয়াম, নিকেল ও সীসার দূষণকে “heavy pollution“ এবং আ্যন্টিমনির দূষণকে “serious pollution“হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণা-পর্যালোচনায় বুড়িগঙ্গার পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেনের মাত্রা ২০০০ সালে প্রায় ২ মিলিগ্রাম/লিটার থেকে ২০১৯ সালের পর্যবেক্ষণে শূন্যে নেমে আসার তথ্য উঠে আসে। একই গবেষণায় পানিতে Biochemical Oxygen Demand (BOD) ও Chemical Oxygen Demand (COD)-এর উচ্চমাত্রাসহ বিভিন্ন ভারী ধাতুর দূষণের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। BOD হলো পানিতে থাকা জৈব পদার্থ ভাংতে অনুজীবের প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের পরিমাণ। আর COD হলো পানিতে থাকা জৈব ও অক্সিডাইজযোগ্য পদার্থকে রাসায়নিকভাবে ভাংতে প্রয়োজনীয় অক্সিজেনের পরিমান- দুটোর মাত্রা বেশি হলে সাধারনত পানি দূষণের মাত্রাও বেশি বোঝায়। অন্যদিকে ২০২২ সালে Frontiers in Public Health- এ প্রকাশিত এক গবেষণায় ঢাকার নদী ব্যবস্থার বিভিন্ন নিষ্কাশন পথ বিশ্লেষণ করে শিল্পবর্জ্য, পেীরবর্জ্য ও গৃহস্থলী পয়ঃবর্জ্কে নদীদূষণের অন্যতম উৎস হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সব মিলিয়ে গবেষণাগুলো দেখায়, বুড়িগঙ্গার সংকট কেবল দৃশ্যমান ময়লা বা দুর্গন্ধের বিষয় নয়; এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘদিনের শিল্পবর্জ্য, পয়ঃবর্জ্য ও অপরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনার সম্মিলিত চাপ। তাই নদীকে বাঁচাতে শুধু পানি পরিষ্কার করাই যথেষ্ট নয়; দূষণের উৎসগুলোকে নিয়ন্ত্রন করাই হতে হবে মূল লক্ষ।
নদীর পানি দূষিত হওয়ার সাথে সাথে এর প্রথম প্রভাব পড়ে নদীর জীববৈচিত্রে। পানিতে অক্সিজেনের ঘাটতি তৈরী হলে জলজ প্রানীর স্বাভাবিক জীবন ব্যাহত হয়। ভারী ধাতু ও অন্যান্য দুষকের উপস্খিতি দীর্ঘমেয়াদে জলজ পরিবেশের জন্য ঝুঁকি তৈরী করে। বুড়িগঙ্গার দুষণের প্রভাব শুধু নদীর পানি বা নদী নির্ভর মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব ছড়িয়ে পড়ছে পুরো ঢাকার জনজীবনেও। নদীর পানিতে জমে থাকা পচনশীল বর্জ্য ও অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য থেকে তৈরী হচ্ছে দুর্গন্ধ, যা নদীর আশপাশের বসতি ও ব্যস্ত এলাকাগুলোর মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে অস্বস্তিকর করে তুলছে। দূষিত ও স্থবির পানির সঙ্গে মশার প্রজনন পরিবেশ তৈরী হচ্ছে, যা নগরবাসীর জন্য মশাবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে নদী ও নগর ড্রেনেজ ব্যবস্থার দূর্বলতার কারনে পুরো নগরীতেই জলাবদ্ধতার কারন হয়ে দাড়ায়। ফলে নোংরা পানির সংস্পর্শে এসে ত্বকের সমস্যা, পানিবাহিত রোগসহ বিভিন্ন স্বাস্থঝুঁকি তৈরী হতে পারে। তাই বুড়িগঙ্গার দূষণকে শুধু একটি নদী রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখলে এর পরিবেশ, জীববৈচিত্র ,জনজীবন, জীবিকা ও জনস্বাস্থের ওপর বিস্তৃত প্রভাবটি আড়ালে থেকে যায়।
বুড়িগঙ্গার দূষণ নিয়ে আলোচনা করতে ঘিয়ে বারবার নদীর পাড়ের বর্জ্য কিংবা পয়ঃনিষ্কাশনের কথা আসে। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে আরও বড় একটি বাস্তবতা- ঢাকার উপর ক্রমাগত বাড়তে থাকা মানুষের চাপ। একটি সীমিত ভেীগলিক এলাকায় বিপুল সংথ্যক মানুষ, শিল্প, ব্যবসা ও নাগরিক কার্যক্রম কেন্দ্রীভূত হলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে পানি পয়ঃনিষ্কাশন ও পরিবেশ রক্ষা- সবকিছুর উপরেই চাপ বাড়ে। বুড়িগঙ্গা সেই চাপের একটা দৃশ্যমান ফলাফল মাত্র।
ঢাকার ওপর মানুষের চাপ কমানোর কথা শুধু নীতিনির্ধারণী আলোচনা নয়, গবেষণাতেও উঠে এসেছে। ২০১৯ সালে Environment and Urbanisation ASIA-তে প্রকাশিত “City Profile:Dhaka, Bangladesh “ গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রশাসনিক কর্মকাণ্ড চাকরি ও বিভিন্ন সেবার অতিরিক্ত কেন্দ্রীভবন ঢাকার ওপর বড় চাপ তৈরী করছে। গবেষকরা এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিভিন্ন কর্মকাণ্ডকে রাজধানীর বাইরে ছড়িয়ে দেওয়ার বা বিকেন্দ্রীকরনের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেছেন।
২০২৬ সালের একটি গবেষণায় ঢাকার পরিবেশগত চাপ কমাতে শহরের বাইরের অঞ্চলগুলোতে পরিকল্পিত ও বিকেন্দ্রীভূত নগরায়নের সম্ভাবনা বিশ্লেষন করা হয়েছে। গবেষণায় একাধিক কেন্দ্রভিত্তিক নগর কাঠামোর সম্ভাবনার কথাও উঠে এসেছে। একই বছর পূর্বাচল নিউ টাউন নিয়ে প্রকাশিত আরেক গবেষণায় দেখা যায়, শুধু নতুন আবাসিক এলাকা তৈরী করলেই ঢাকার ওপর নির্ভরতা কমে না; স্থানীও কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সাথে সংযোগ না থাকলে বিকেন্দ্রীকরনের লক্ষ পুরোপুরি অর্জিত হয় না। অর্থাৎ মানুষকে শুধু ঢাকার বাইরে পাঠিয়ে দিলেই সমাধান হবে না, প্রয়োজন এমন পরিকল্পিত নগর ও আঞ্চলিক কেন্দ্র তৈরী করা, যেখানে কর্মসংস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, যোগাযোগ ও প্রয়োজনীও নাগরিক সুযোগ-সুবিধা থাকবে। কারন একটি ছোট ভেীগলিক এলাকায় ক্রমাগত মানুষের চাপ বাড়িয়ে রেখে শুধু নদী পরিষ্কার করে দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের ভারসাম্য ফিরিয়ে আনা কঠিন। ঢাকার ওপর চাপ কমানো গেলে বর্জ্য, পয়ঃনিষ্কাশন ও অন্যান্য নগর সমস্যার ওপরও চাপ কমানো সম্ভব।
বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর সমাধান তাই শুধু নদীর পানিতে রাসায়নিক প্রয়োগ কিংবা নিয়মিত পরিষ্কারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ করা যাবে না। প্রথমেই বন্ধ করতে হবে নদীতে বর্জ্য ও অপরিশোধিত পয়ঃবর্জ্য ফেলার পথ। শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কার্যকর শোধনাগার নিশ্চিত করতে হবে। নদীর দখল ও অবৈধ স্থাপনা নিয়ন্ত্রনের পাশাপাশি নিয়মিত নজরদারি ও পানি পরীক্ষা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদে ঢাকার ওপর মানুষের চাপ কমাতে হবে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পরিকল্পিত শিল্প, ব্যবসা, শিক্ষা ও চিকিৎসার সুযোগ তৈরী করতে হবে। গড়ে তুলতে হবে শক্তিশালী আঞ্চলিক শহর, যাতে মানুষেকে জীবিকা ও নাগরিক সুবিধার জন্য রাজধানী নির্ভর হতে না হয়। তাই বুড়িগঙ্গাকে বাঁচাতে হলে শুধু নদীর দিকে তাকালে হবে না; তাকাতে হবে পুরো নগর ব্যবস্থাপনার দিকে।
একসময় এ নদীর স্রোত ঢাকার বানিজ্য ও জনজীবনকে এগিয়ে নিয়েছিল। আজ সে নদী বয়ে নিয়ে যাচ্ছে নগরীর বিশাল জনগোষ্ঠির চাপ ও অবহেলাকে। মৃতপ্রায় নদীটিতে আবারও প্রানের সঞ্চার করতে হলে শুধু পানি পরিবর্তন নয়- পরিবর্তন করতে হবে সে নগর ভাবনাকেও, যে ভাবনা এক শহরের ওপর ক্রমাগত চাপ বাড়িয়ে চলেছে। বুড়িগঙ্গাকে বাঁচানোর লড়াই তাই শেষ পর্যন্ত একটি নদীকে বাঁচানোর গল্প নয়; এটি একটি ভবিষ্যৎ বাসযোগ্য, ভারসাম্যপূর্ন ও পরিকল্পিত নগর তৈরীর লড়াই।
মারুফ/