
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
সকালের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। পাহাড়ের গায়ে লেগে থাকা হালকা কুয়াশা ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে, আর তার নিচে নীলাভ জলের বিশাল বিস্তার যেন নীরবে জেগে উঠছে। দুরে ছোট্ট একটি নেীকা জলের বুক চিরে এগিয়ে যায়; তার পেছনে তৈরী হওয়া ঢেউ এসে মিলিয়ে যায় লেকের শান্ত জলে। চারপাশে যতদূর চোখ যায় সবুজ পাহাড়, পাহাড়ের গায়ে গায়ে গাছপালা আর তার মাঝে বিস্তৃত কাপ্তাই লেক। কখনো মেঘের ছায়া এসে পড়ে জলের ওপর, কখনো রোদের ঝিলিক বদলে দেয় পুরো দৃশ্যের রঙ। কখনো পাহাড়ের গায়ে মেঘের ছায়া, কখনো স্বচ্ছ জলে ভেসে থাকা নেীকা; সব মিলিয়ে লেকের সেীন্দর্যে আছে এক ধরনের গভীর প্রশান্তি। ভোরের নরম আলোয় কুযাশার আবরণ ভেদ করে যখন পাহাড় যেগে ওঠে, তখন কাপ্তাই লেক যেন প্রতিটি মুহূর্তে তার পরিবর্তিত রূপ দিয়ে মুগ্ধ করে প্রকৃতিপ্রেমীদের।
রাঙ্গামাটির পাহাড়ের ভাজ পেরিয়ে যখন নেীকা কাপ্তাই লেকের গভীরে ঢুকে যায়, চারপাশে তখন শুধু পানি আর পাহাড়ের নৈস্বর্গিক সেীনর্য চোখ জুড়িয়ে যায়। দেখে মনে হয় এ যেন প্রকৃতির নিজস্ব সৃষ্টি। কিন্তু কাপ্তাই লেকের গল্প পুরোপুরি প্রাকৃতিক নয়। এই বিশাল জলরাশির জন্ম হয়েছিল একটি বাধের কারনে। ফলে একদিকে তৈরী হয়েছে অপার সেীন্দর্য ও মৎস ভান্ডার, অপরদিকে বিশাল জলরাশির নিচে চাপা পরেছে একটি জনপদের গল্প। যা পার্বত্য অঞ্চলের উত্তপ্ততার জন্যও কিছুটা দায়ী।
কাপ্তাই লেকের সঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ভূখন্ডের পরিবর্তন, মানুষের জীবন-জীবিকা এবং একটি দীর্ঘ ইতিহাস। পাহাড় ও জলকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই বিশাল জলাধার আজ রাঙ্গামাটির পরিচয়ের অন্যতম অংশ। পর্যটকের ছোখে এটি প্রকৃতির অপার সেীন্দর্য; স্থানীয় মানুষদের কাছে আবার এই জলই জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
কাপতাই লেকের সেীনদর্যের সব থেকে বড় বৈশিষ্ট্য তার বৈচিত্র। এক জায়গায় দাঁড়িয়ে পুরো লেককে দেখা যায় না; বরং পাহাড়ি পথ পেরিয়ে, বাক ঘুরে বারবার তার নতুন রূপের মুখোমুখি হতে হয়। কখনো শান্ত জলরাশি, কখনো পাহাড়ের গা ঘেঁষে সরু জলপথ, আবার কোথাও বিস্তৃত জলভূমি- প্রতিটি দৃশ্যই আলাদা। বর্ষায় চারপাশের সবুজ আরও ঘন হয়ে ওঠে। পাহাড়ের ঢালে বৃষ্টির জল নেমে আসে, আকাশের মেঘের ছায়া পড়ে লেকের ওপর। শীতের সকালে কুয়াশা আর নরম রোদ মিলে তৈরী করে এক অন্যরকম আবহ। আর বিকেলের শেষ আলো যখন পাহাড়ের গায়ে পড়ে, তখন জলের ওপরও তার প্রতিফলন দেখা যায়। প্রকৃতির এই আলো ছায়িার খেলা কাপতাই লেককে শুধু একটি জরাধার নয়, একটি জীবন্ত দৃশ্যে পরিনত করে।
আজকের এই বিশাল জলরাশির পেছনে রয়েছে কাপ্তাই বাঁধ নির্মানের ইতিহাস। কর্নফুলী নদীর ওপর বাঁধ নির্মাণের ফলে ১৯৬০ এর দশকে তৈরী হয় এই কাপ্তাই লেক। এর ফলে তৎকালীন পার্বত্য চট্টগ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা পানির নিচে চলে যায় এবং বহু মানুষ তাদের বসতভিটা ও জমি হারান। তাই কাপ্তাই লেকের গল্প শুধু পর্যঠনের গল্প নয়। এর সেীন্দর্যের আড়ালে রয়েছে মানুষের বাস্তুচ্যুতি ও ভূমি হাড়ানোর স্মৃতিও। স্রষ্টার তুলিতে আঁকা এ ভূমিদৃশ্য কারও কাছে যেমন ভ্রমনের আকর্ষণ, অন্য কারও কাছে তেমনি বিশাল জলাভূমিতে অতীতের সুন্দর স্মৃতির পানিচাপা পড়ার কষ্ট বহন করে।
সকাল বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে লেকের চেহারাও বদলে যায়। পর্যটকদের নেীকা যেমন এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ছুঠে চলে, তেমনি স্থানীয় মানুষের নেীকাও চলে জীবিকার প্রয়োজনে। কারও জন্য নেীকা পরিবহনের মাধ্যম, কারও জন্য মাছ ধরার উপায়, আবার কারও জীবনের সঙ্গে এটি প্রতিদিনের কর্মস্থলের মতো জড়িয়ে আছে। লেকের তীরবর্তী জনপদগুলোর জীবনও এই জলরামিকে ঘিরেই আবর্তিত। দূর্গম পাহাড়ি অঞ্চলের অনেক স্থানেই নেীপথ যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ন মাধ্যম। ফলে কাপ্তাই লেকের জল শুধু প্রকৃতির সেীন্দর্যই বহন করে না; মানুষের চলাচল, ব্যবসা-বানিজ্য ওজীবিকার সঙ্গেও এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে এসে যখন কেউ নেীকায় ওঠেন, তখন এক স্বর্গীয় প্রশান্তি অনুভূত হয় হৃদয়ে। ইঞ্জিনের মৃদু আওযাজের সঙ্গে মিশে থাকে পানির ছলাৎছল শব্দ। সামনে শুধু পাহাড় আর জল। কোন কোন জায়গায় মনে হয়, পাহাড়গুলো যেন জলরাশির ওপর ঝুঁকে পড়ছে । কাপ্তাই লেকের আকর্ষণ এখানেই- এখানে প্রকৃতিকে দেখতে হয় চলতে চলতে। একটি জায়গায় দাড়িয়ে পুরো সেীন্দর্য ধরা পরে না। নেীকা যত এগোয়, দৃশ্য তত বদলায়। কখনো সামনে উন্মুক্ত হয় বিশাল জলরাশি, আব্র কখনো বাঁক ঘুরতেই দৃষ্টি আটকে যায় ঘন সবুজ পাহাড়ে।
এই পরিবর্তনশীল দৃশ্যই কাপ্তাইকে অন্য অনেক পর্যটনস্থল থেখে আলাদা করেছে। এখানে সেীন্দর্য কোন স্থির ছবির মত নয়; বরং চলমান।
কাপ্তাই লেককে ঘিরে পর্যটন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে স্থানীও অর্থনীতিতেও এর প্রভাব পড়েছে। নেীযান, হোটেল-রেস্তরাঁ, ছোট ব্যবসা ও বিভিন্ন পর্যটন সেবা অনেক মানুষের আয়ের সঙ্গে যুক্ত। ফলে লেকের সেীন্দর্য শুধু পর্যটকদের আনন্দ দেয় না; এটি সথানীও অর্থনীতিরও একটি অংশ।
তবে এই সেীন্দর্য টিকিয়ে রাখার দায়িত্বও কম কম নয়। পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাস্টিক ও অন্যান্য বর্জ্য, নেীযানের চাপ এবং অনিয়ন্ত্রিত পর্যটন পরিবেশের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে। পাহাড় কাটা বনভূমির ক্ষতি কিংবা জলদূষণের মত বিষয়গুলোও দীর্ঘমোদে প্রাকৃতিক পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।
তাই কাপ্তাই লেককে দেখার অর্থ শুধু তার সেীন্দর্যে মুগ্ধ হওয়া নয়; বরং সেই সেীন্দরর্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের গভীর সম্পর্ককেও বোঝা, প্রাকৃতিক পরিবেশকে রক্ষা করা।
বিকেল গড়িয়ে যখন সূর্য পাহাড়ের আড়ালে নামতে শুরু করে, তখন লেক আবার শান্ত হয়ে আসে। জলের ওপর পরে শেষ বিকেলের আলো। দূরের পাহাড় ধীরে ধীরে অন্ধকার হতে থাকে। কোন নেীকা তখনো ফিরছে, কোথাও জলের ওপর শেষবারের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠছে অর্ধলুকায়িত সূর্যের আলো। সন্ধ্যা নামার সাথে সাথে দিনের কোলাহল কমে আসে। কিন্তু কাপ্তাই লেকের স্নিগ্ধতায় কোন কমতি আসে না- পাহাড়ের বুকে বিস্তৃত, নীরব অথচ জীবন্ত।
হয়তো একারনেই কাপ্তাই লেককে শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র বলে শেষ করা যায় না। এটি একই সাথে প্রকৃতির এক অসাধারন সৃষ্টি, মানুষের জীবনের অংশ, জলবিদ্যূতের অপার সম্ভাবনা এবং ইতিহাসের এক দীর্ঘ স্মারক। পাহাড়ের সবুজ আর জল আর আকাশের নীলের যে দৃশ্য প্রথমে একজন পর্যটককে থামিয়ে দেয়, গভীরভাবে তাকালে সেই দৃশ্যের ভেতরই দেখা যায় মানুষ, ইতিহাস, জীবিকা ও পরিবর্তনের বহুস্তরীয় গল্প।
মারুফ/