
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
ফ্যাটি লিভার এখন আর বিরল কোনো স্বাস্থ্যসমস্যা নয়। অনেকেরই পরীক্ষায় ধরা পড়ছে লিভারে অতিরিক্ত চর্বি জমার বিষয়টি। তবে সমস্যা ধরা পড়ার পর অনেকেই দ্রুত সমাধানের আশায় ডিটক্স ড্রিংক, বিশেষ জুস কিংবা নানা ঘরোয়া উপায়ের দিকে ঝুঁকছেন।
বাস্তবতা হলো, ফ্যাটি লিভার দূর করার কোনো ‘জাদুকরি’ পানীয় নেই। লিভারে জমে থাকা চর্বি কমাতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো ওজন নিয়ন্ত্রণ, স্বাস্থ্যকর খাবার এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম।
লিভারে অল্প পরিমাণ চর্বি থাকা স্বাভাবিক। কিন্তু অতিরিক্ত চর্বি জমলে তাকে ফ্যাটি লিভার বলা হয়।
অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণের কারণে ফ্যাটি লিভার হতে পারে। আবার অ্যালকোহল পান না করলেও স্থূলতা, টাইপ-২ ডায়াবেটিস, ইনসুলিন প্রতিরোধ, রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস
অ্যালকোহল ছাড়া বিপাকীয় সমস্যার সঙ্গে সম্পর্কিত ফ্যাটি লিভারকে বর্তমানে metabolic dysfunction-associated steatotic liver disease (MASLD) বলা হয়।
সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, ফ্যাটি লিভার অনেক সময় কোনো স্পষ্ট উপসর্গ তৈরি করে না। ফলে অন্য কোনো কারণে পরীক্ষা করতে গিয়ে অনেকের রোগটি ধরা পড়ে।
অতিরিক্ত ওজন থাকলে ওজন কমানো ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।
গবেষণাভিত্তিক নির্দেশনা অনুযায়ী, শরীরের মোট ওজনের অন্তত ৫ শতাংশ কমাতে পারলে লিভারে জমে থাকা চর্বি কমতে পারে। ৭ থেকে ১০ শতাংশ ওজন কমাতে পারলে লিভারের প্রদাহসহ রোগের আরও কিছু বৈশিষ্ট্যের উন্নতি হতে পারে।
তবে দ্রুত ওজন কমানোর চেষ্টা না করে ধীরে ধীরে ওজন কমানোই নিরাপদ। খুব কম ক্যালরির খাবার খাওয়া কিংবা দীর্ঘ সময় না খেয়ে থাকার মতো কঠোর পদ্ধতি অনুসরণ করার আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়া ভালো।
ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে খাবার থেকে অতিরিক্ত চিনি কমানো গুরুত্বপূর্ণ।
কোমল পানীয়, চিনি দেওয়া চা-কফি, প্যাকেটজাত মিষ্টি পানীয়, মিষ্টি ও অতিরিক্ত চিনি থাকা খাবার যতটা সম্ভব কমানো উচিত।
বিশেষ করে অতিরিক্ত ফ্রুক্টোজ বা যোগ করা চিনি থাকা খাবার ও পানীয় সীমিত করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
তবে ফ্যাটি লিভার হয়েছে বলে সব ফল বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ফলের প্রাকৃতিক চিনি আর কোমল পানীয় বা মিষ্টি খাবারে যোগ করা চিনি এক বিষয় নয়।
অতিরিক্ত স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাটযুক্ত খাবার নিয়মিত খাওয়া স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত মাংস, ভাজাপোড়া এবং কিছু প্রক্রিয়াজাত খাবারে এ ধরনের চর্বি বেশি থাকতে পারে।
এর বদলে মাছ, বাদাম, বীজ, অ্যাভোকাডোসহ অসম্পৃক্ত চর্বির স্বাস্থ্যকর উৎস বেছে নেওয়া যেতে পারে।
বাংলাদেশি খাবারের ক্ষেত্রে সহজ পরিবর্তন হতে পারে—একই খাবার অতিরিক্ত তেলে ভাজার বদলে কম তেলে রান্না করা এবং খাবারে মাছ, ডাল ও শাকসবজির পরিমাণ বাড়ানো।
ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লেই ভাত একেবারে বাদ দিতে হবে—এমন কোনো নিয়ম নেই।
তবে সাদা ভাত, সাদা পাউরুটি ও অন্যান্য পরিশোধিত শর্করা অতিরিক্ত খাওয়ার বদলে আঁশসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়া ভালো।
NIDDK-এর তথ্য অনুযায়ী, কম গ্লাইসেমিক ইনডেক্সযুক্ত খাবার, যেমন অধিকাংশ শাকসবজি, কিছু ফল ও পূর্ণ শস্য, রক্তে শর্করার ওপর তুলনামূলক কম প্রভাব ফেলে।
তাই ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে সঙ্গে বেশি সবজি, ডাল ও প্রোটিন রাখা যেতে পারে।
ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণে খাদ্যতালিকায় শাকসবজি, ডাল, ছোলা, মসুর ডাল, পূর্ণ শস্য, বাদাম ও বীজ রাখতে পারেন।
আঁশসমৃদ্ধ এসব খাবার দীর্ঘ সময় পেট ভরা রাখতে সাহায্য করতে পারে। ফলে অতিরিক্ত খাওয়ার প্রবণতা কমানোও সহজ হয়।
স্বাস্থ্যকর খাদ্যতালিকায় রাখতে পারেন—
ভূমধ্যসাগরীয় খাদ্যপদ্ধতিতেও শাকসবজি, ফল, পূর্ণ শস্য, ডাল, বাদাম, মাছ ও স্বাস্থ্যকর চর্বিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশি খাবারের সঙ্গেও এই ধারণা সহজেই মানিয়ে নেওয়া সম্ভব।
অ্যালকোহল লিভারের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করতে পারে।
অ্যালকোহলজনিত ফ্যাটি লিভার থাকলে সম্পূর্ণভাবে অ্যালকোহল বন্ধ করার পরামর্শ দেওয়া হয়। অন্য কারণে হওয়া ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রেও অ্যালকোহল কমানো বা এড়িয়ে চলা ভালো।
লিভারের রোগ থাকলে কতটা অ্যালকোহল নিরাপদ—তা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হতে পারে। তাই চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।
ফ্যাটি লিভার কমাতে শুধু খাবারের পরিবর্তন করলেই হবে না, নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রমও গুরুত্বপূর্ণ।
হাঁটা, দ্রুত হাঁটা, সাইকেল চালানো, সাঁতারসহ অ্যারোবিক ব্যায়ামের পাশাপাশি পেশিশক্তি বাড়ানোর ব্যায়ামও করা যেতে পারে।
সাধারণভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্য রাখতে বলা হয়। যারা একেবারেই ব্যায়াম করেন না, তারা অল্প সময় দিয়ে শুরু করে ধীরে ধীরে সময় বাড়াতে পারেন।
সবসময় নয়।
ফ্যাটি লিভারের কারণ ও মাত্রা ব্যক্তিভেদে আলাদা। কারও ক্ষেত্রে শুধু লিভারে চর্বি জমে থাকতে পারে, আবার কারও ক্ষেত্রে প্রদাহ ও ফাইব্রোসিসও থাকতে পারে।
দীর্ঘদিন অবহেলা করলে কিছু মানুষের রোগ আরও গুরুতর হয়ে সিরোসিস বা লিভারের অন্যান্য জটিলতায় এগিয়ে যেতে পারে।
তাই ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে শুধু ঘরোয়া উপায়ের ওপর নির্ভর না করে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নিয়মিত ফলোআপ করা জরুরি।
ফ্যাটি লিভার দূর করার নামে বাজারে নানা ধরনের ডিটক্স পানীয়, হারবাল মিশ্রণ ও বিশেষ জুসের প্রচার দেখা যায়।
কিন্তু লিভার ‘পরিষ্কার’ করার জন্য কোনো নির্দিষ্ট পানীয়কে চিকিৎসা হিসেবে ধরে নেওয়া ঠিক নয়।
ফ্যাটি লিভারের ক্ষেত্রে মূল বিষয় হলো—রোগের কারণ নিয়ন্ত্রণ করা, অতিরিক্ত ওজন থাকলে কমানো, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া এবং নিয়মিত শারীরিক পরিশ্রম করা।
ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লেই নিজের ইচ্ছায় কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট খাওয়া উচিত নয়।
কিছু ক্ষেত্রে ভিটামিন-ই নিয়ে গবেষণা হয়েছে। তবে এর সম্ভাব্য উপকার ও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া বিবেচনা করে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এটি গ্রহণ করা ঠিক নয়।
একইভাবে কিছু ওষুধ বা হারবাল সাপ্লিমেন্টও লিভারের ক্ষতি করতে পারে। তাই নিয়মিত কোনো ওষুধ বা সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করলে চিকিৎসককে তা জানানো গুরুত্বপূর্ণ।
সকালে: চিনি ছাড়া চা বা কফির সঙ্গে ডিম, আটার রুটি কিংবা ওটস রাখতে পারেন।
দুপুরে: ভাতের পরিমাণ নিয়ন্ত্রণ করে মাছ বা মুরগি, ডাল এবং প্রচুর সবজি রাখুন।
বিকেলে: মিষ্টি বিস্কুটের বদলে বাদাম, ছোলা বা একটি ফল খেতে পারেন।
রাতে: ভাত বা রুটির পরিমাণ কমিয়ে সবজি ও প্রোটিনের পরিমাণ বাড়াতে পারেন।
ব্যায়াম: প্রতিদিন হাঁটা দিয়ে শুরু করুন। ধীরে ধীরে সপ্তাহে অন্তত ১৫০ মিনিট মাঝারি মাত্রার শারীরিক কর্মকাণ্ডের লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেন।
ফ্যাটি লিভার কমানোর কোনো ম্যাজিক ড্রিংক বা জাদুকরি ঘরোয়া উপায় নেই। লিভারে জমে থাকা চর্বি কমানোর সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো দীর্ঘমেয়াদি জীবনযাপনে পরিবর্তন আনা।
অতিরিক্ত চিনি ও ভাজাপোড়া কমানো, অস্বাস্থ্যকর চর্বির বদলে স্বাস্থ্যকর চর্বি বেছে নেওয়া, শাকসবজি ও আঁশসমৃদ্ধ খাবার বাড়ানো, পরিমিত কার্বোহাইড্রেট খাওয়া, নিয়মিত ব্যায়াম করা এবং অতিরিক্ত ওজন থাকলে ধীরে ধীরে ওজন কমানো—এসব অভ্যাসই হতে পারে ফ্যাটি লিভার নিয়ন্ত্রণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
সবচেয়ে জরুরি হলো, ফ্যাটি লিভারকে অবহেলা না করা। কারণ অনেক সময় কোনো উপসর্গ ছাড়াই এই সমস্যা থাকতে পারে। পরীক্ষায় ফ্যাটি লিভার ধরা পড়লে রোগের কারণ ও মাত্রা বুঝে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও জীবনযাপনে পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে নিরাপদ পথ।
সূত্র: হেল্থ লাইন
/টি