
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
জলবায়ু পরিবর্তনের চরম ও নির্মম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলো। কখনো অসময়ের বন্যা, কখনো তীব্র তাপদাহ, আবার কখনো সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, প্রকৃতির এই রুদ্ররূপ এখন এই অঞ্চলের কোটি কোটি মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে কিংবা বর্তমানের পরিসংখ্যানে, বিশ্বজুড়ে যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন এবং পরিবেশ দূষণ ঘটছে, তার জন্য দক্ষিণ এশিয়ার এই দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর দায় একেবারেই নগণ্য। দায় যাদের সবচেয়ে বেশি, সেই উন্নত বিশ্ব প্রতিনিয়ত কার্বন নিঃসরণ বাড়িয়েই চলেছে, কিন্তু ক্ষতিগ্রস্ত রাষ্ট্রগুলোকে ন্যায্য ক্ষতিপূরণ দিতে তারা চরম উদাসীন।
এমন এক বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক সংকটের প্রেক্ষাপটে, দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু নেতৃত্ব, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নকে এগিয়ে নিতে নেপালে শুরু
মঙ্গলবার (৭ জুলাই) সন্ধ্যায় কাঠমান্ডুর প্রাণকেন্দ্রে ‘ওয়ালনাট বিস্ট্রো’-তে (Walnut Bistro) এই জলবায়ু ক্যাম্পের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেপাল সরকারের কৃষি, বন ও পরিবেশমন্ত্রী গীতা চৌধুরী। নিজের বক্তব্যে জলবায়ু ইস্যুতে উন্নত বিশ্বের বিরুদ্ধে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর অধিকারের কথা জোরালোভাবে তুলে ধরেন এই মন্ত্রী। গীতা চৌধুরী বলেন, জলবায়ু সংকট মোকাবিলায় উন্নত বিশ্বের সহযোগিতা চাওয়া মানে কোনো ভিক্ষা চাওয়া নয়, এটা আমাদের অধিকার। তারা অবাধে পরিবেশ দূষণ করে আমাদের জীবন ও প্রকৃতিকে বিপদে ফেলছে, সুতরাং ক্ষতিপূরণ তাদেরই দিতে হবে। এই ঐতিহাসিক দায়ের অবসান ঘটাতে হবে। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে উন্নত দেশগুলোর কাছ থেকে নিজেদের ন্যায্য পাওনা বুঝে নিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর মধ্যে ঐক্য গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। এই ধরনের আঞ্চলিক ক্যাম্প সেই ঐক্য গড়ার ক্ষেত্রে মাইলফলক হিসেবে কাজ করবে বলেও মত গীতা চৌধুরীর।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে নেপালের সংসদ সদস্য ও এপিএমডিডি'র চেয়ারম্যান ড. অর্জুন কার্কি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন কোনো ভৌগোলিক সীমানা চেনে না। কোনো একটি নির্দিষ্ট দেশের পক্ষে এককভাবে এই বৈশ্বিক মহামারি সদৃশ সংকট সমাধান করা অসম্ভব। তিনি বলেন, সবার সমন্বিত প্রচেষ্টায় জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলা করতে হবে। আঞ্চলিক সহযোগিতার মাধ্যমে এই কাজ সহজ হবে। বিনিয়োগ, জ্ঞান ও পারস্পরিক সহায়তার মাধ্যমে এই অঞ্চলের মানুষের জীবন রক্ষা করা আমাদের যৌথ দায়িত্ব।
উদ্বোধনী অধিবেশনে বিশেষ আকর্ষণ হিসেবে উপস্থিত ছিলেন নেপালে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার শফিকুর রহমান। তিনি বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান এবং জলবায়ুগত ঝুঁকির কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন এখন আর কোনো সেমিনার বা এসি রুমে বসে আলোচনার তাত্ত্বিক বিষয় নয়। বাংলাদেশের মতো উপকূলীয় ও নদীমাতৃক রাষ্ট্রের জন্য এটা এখন এক কঠিন ও নিষ্ঠুর বাস্তবতা। প্রতিদিন মানুষ ভিটেমাটি হারাচ্ছে, লবণাক্ততার কারণে জমি উর্বরতা হারাচ্ছে।
বাংলাদেশি এই কূটনীতিক জোর দিয়ে বলেন, জলবায়ুর এই আসন্ন ও চলমান অভিঘাত মোকাবিলায় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এখন দক্ষতা অর্জন ও দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। তার কথায়, আমাদের এখন সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তথ্য ও প্রযুক্তি বিনিময়। কার্বন কমানোর পাশাপাশি কীভাবে আমরা অভিযোজন প্রক্রিয়া জোরদার করতে পারি, তা নিয়ে কাজ করতে হবে। এই ধরনের আন্তর্জাতিক ক্যাম্পের মাধ্যমেই বিভিন্ন দেশের তরুণ ও বিশেষজ্ঞদের মধ্যে দক্ষতা বিনিময়ের চমৎকার সুযোগ তৈরি হয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এই ক্যাম্প আয়োজনের পেছনে মূল চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে দক্ষিণ এশিয়ার বেশ কয়েকটি পরিবেশবাদী সংগঠন। এর মধ্যে অন্যতম প্রধান মিশন গ্রিন বাংলাদেশ (Mission Green Bangladesh)। ক্যাম্পের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে জানতে চাইলে সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক আহসান রনি বলেন, এই আয়োজনের মূল লক্ষ্য দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের মধ্যে একটি শক্তিশালী ও দীর্ঘমেয়াদি নেটওয়ার্কিং বা যোগাযোগ সূত্র সৃষ্টি করা।
“আমরা প্রতিবেশী দেশগুলোর জলবায়ুজনিত সমস্যাগুলো সম্পর্কে কেবল গণমাধ্যমে দেখি। কিন্তু এই ক্যাম্পে তরুণরা সরাসরি একে অপরের মুখোমুখি বসে অভিজ্ঞতা ও সংকটের গল্প বিনিময় করতে পারছে। একইসঙ্গে তরুণদেরকে আগামীর জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় নেতৃত্ব দেওয়ার উপযোগী হিসেবে গড়ে তোলাই আমাদের মূল লক্ষ্য। কারণ আজকের তরুণরাই আগামী দিনের নীতিনির্ধারক হবে, যোগ করেন আহসান রনি।
পাঁচ দিনব্যাপী এই আন্তর্জাতিক জলবায়ু ক্যাম্পের কর্মসূচিগুলো সাজানো হয়েছে তাত্ত্বিক জ্ঞান এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তব অভিজ্ঞতার এক অপূর্ব সমন্বয়ে। ক্যাম্পের প্রথম দিন কাঠমান্ডুতে জলবায়ু বিজ্ঞান, নেতৃত্ব বিকাশ, কমিউনিটিভিত্তিক অভিযোজন, নীতি সংলাপ ও পরিবেশ শিক্ষার ওপর আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞদের পরিচালনায় সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। এরপর ক্যাম্পের প্রতিনিধি দলটি যাবে নেপালের বিখ্যাত পর্যটন শহর পোখরায়। সেখানে ঘরের ভেতরের আলোচনার গণ্ডি পেরিয়ে প্রতিনিধিরা প্রকৃতির কাছাকাছি গিয়ে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব অবলোকন করবেন।
বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশ বাস করে দক্ষিণ এশিয়ায়। অথচ এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন আজ জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হুমকির মুখে। দক্ষিণ এশীয় আঞ্চলিক সহযোগিতা সংস্থা (সার্ক) দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ক্রিয় থাকায় জলবায়ু ইস্যুতে এই অঞ্চলের দেশগুলোর যৌথ দরকষাকষির প্ল্যাটফর্ম দুর্বল হয়ে পড়েছে। এমন সময়ে তরুণদের এই উদ্যোগ আঞ্চলিক কূটনীতিতে এক নতুন মাত্রা যোগ করছে।
আয়োজক এবং আন্তর্জাতিক জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের প্রত্যাশা, এই ক্যাম্প দক্ষিণ এশিয়ার তরুণদের মধ্যে জলবায়ু নেতৃত্বের একটি শক্তিশালী ও নতুন নেটওয়ার্ক গড়ে তুলবে। এই ক্যাম্প থেকে প্রাপ্ত জ্ঞান, অভিজ্ঞতা এবং পারস্পরিক মেলবন্ধন অংশগ্রহণকারীদের নিজ নিজ দেশে ফিরে গিয়ে টেকসই উন্নয়ন ও জলবায়ু অভিযোজন কার্যক্রমে আরও কার্যকর ও জোরালো ভূমিকা রাখতে সক্ষম করে তুলবে বলেও দাবি সংশ্লিষ্টদের।
কাঠমান্ডুর বুক থেকে শুরু হওয়া তরুণ পরিবেশকর্মীদের এই সম্মিলিত কণ্ঠস্বর ও অধিকারের দাবি একদিন বৈশ্বিক জলবায়ু নীতি নির্ধারণে প্রভাব ফেলবে এবং উন্নত বিশ্বকে তাদের ঐতিহাসিক দায় স্বীকার করতে বাধ্য করবে, এমনটাই আশা করছেন এই ক্যাম্পের প্রতিনিধিরা।