ঝুঁকির মুখে বিশ্ব ব্যাংকের ৩০০কোটি টাকার বেড়িবাঁধ
30 এপ্রিল 2023, বিকাল 6:00
বলেশ্বর নদের ভাঙ্গনের কবলে রয়েছে বাগেরহাটের শরণখোলার পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের নব নির্মিত টেকসই বেড়ীবাধ। মোরেলগঞ্জের ফাসিয়াতলা থেকে শরণখোলার বগী পর্যন্ত প্রায় ২৫ কিলোমিটার এলাকার ১০টি পয়েন্টে দেখা দিয়েছে এই ভাঙন। ফলে ঝুঁকির মুখে পড়েছে বিশ্ব ব্যাংকের ৩০০ কোটি টাকা ব্যায়ে নির্মিত উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) নির্মিত টেকসই বেড়িবাঁধটি।
বলেশ্বর নদের তীরে নির্মিত বেড়িবাঁধের শরণখোলা উপজেলা অংশের বগী, গাবতলা, তাফালাবাড়ী, চালরায়েন্দা, রাজেশ্বর, জিলবুনিয়া, রাজৈর মারকাজ মসজিদ, বটতলা, পূর্ব খোন্তাকাটা, এবং মোরেলগঞ্জ অংশের ফাসিয়াতলাসহ ১০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে রাজেশ্বর, রাজৈর বটতলা ও ফাসিয়াতলা এলাকার মূল বেড়িবাঁধেই ভাঙন শুরু হয়েছে। নদী শাসন না করে বাঁধ নির্মাণের ফলে এ সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন বাঁধের পাশের বাসিন্দারা।
রবিবার (২৪এপ্রিল) সকালে শরণখোলার সাউথখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ সাউথখালীর গাবতলা এলাকায় বাঁধের পাশের প্রায় দুই বিঘা জমি গাছপালাসহ নদীতে বিলিন হয়ে গেছে।
এদিকে টেকসই বাঁধ বাস্তবায়ন সংস্থা ‘উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্প (সিইআইপি)’ কর্তৃপক্ষ বলছে, তাদের প্রকল্পের কাজ শতভাগ শেষে হয়েছে। আগামী ডিসেম্বরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের কাছে বাঁধটি হস্তান্তর করা হবে। এখানে নতুন কোনো প্রকল্প গ্রহনের সুযোগ নেই তাদের। অন্যদিকে পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, ‘সিইআইপি’ প্রকল্পের কাছে নদী শাসনের অর্থ বরাদ্দ রয়েছে। তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। দুই পক্ষের মধ্যে সমঝোতা স্বাক্ষরের অপেক্ষায় রয়েছে বিষয়টি।
তবে স্থানীয়দের মতে, সিইআইপি ও পনি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বহীনতা এবং তদারকির অভাবে বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। ঝুঁকির মুখে পড়েছে বাঁধটি। বাঁধের স্থায়ীত্ব নিয়েও দেখা দিয়ে সংশয়।
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর প্রলয়ঙ্করি ঘূর্ণিঝড় সিডরের জলোচ্ছাসে বেড়িবাঁধ ভেঙে শরণখোলায় সহস্রাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। এর পর এলাকাবাসীর দাবির পরিপ্রেক্ষিতে টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণের প্রকল্প গ্রহন করে সরকার। উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) মাধ্যমে বিশ্ব ব্যাংকের অর্থায়নে ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ে শরণখোলায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ৩৫/১ পোল্ডারের ৬২ কিলোমিটার টেসকই বেড়িবাঁধ নির্মাণ শুরু হয় ২০১৬ সালের ২৬ জানুয়ারি। কিন্তু তিন বছর মেয়াদের এই প্রকল্পের কাজ ছয় বছরেও শেষ করতে পারেনি চায়না ‘সিএইচডব্লিউই’ নামের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান।
ভাঙনকবলিত গাবতলা এলাকার বাসিন্দা মো. মোকসেদ আলী সরদার,পাভেজ খান, মাহিনুর হোসেন, জানান, বাঁধের বাইরে তার প্রায় আড়াই বিঘা জমিতে অসংখ্য গাছপালা ছিল। রবিবার সকাল ৮টার দিকে হঠাৎ গাছপালাসহ দুই বিঘা জমি নদীতে তলিয়ে যায়। ভাঙন এলাকায় প্রায় ১০০ ফুট গভীর খাদ হয়েছে। মূল বেড়িবাঁধে ভাঙন পৌঁছাতে আর মাত্র ৮-১০ ফুট বাকি আছে।
বাঁধের পাশের বাসিন্দা অধ্যক্ষ আব্দুর রহিম দুলাল খান, পারভেজ খান, রুহুল আমিন খোন্দকার, কালাম মোল্লা, লুৎফর শেখসহ অনেকেই জানান, ভাঙনের ফলে তারা আতঙ্কে রয়েছেন। বর্ষা শুরু হলে ভাঙন আরো বাড়বে। তখন মূল বেড়িবাঁধও ভাঙনের হাত থেকে রক্ষা পাবে না। নদী শাসন না করার কারণে এমন ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে।
সাউথখালী ইউনিয়নের দক্ষিণ সাউথখালী ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. জাকির হোসেন হাওলাদার বলেন, নদীর ভাঙন দিন দিন বাঁধের কাছে চলে আসছে। হঠাৎ হঠাৎ বিশাল অংশ নিয়ে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। দ্রুত নদী শাসন করা না হলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমেই মূল বাঁধে ভাঙন ধরবে।ইউপি সদস্য আরো বলেন, বাঁধ নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। সিইআইপি প্রকল্পের লোকজনের তদারকি না থাকায় চায়নার ঠিকাদাররা তাদের ইচ্ছেমতো কাজ করেছে। বাঁধটি সম্পূর্ণ বালু দিয়ে নির্মাণ করা হয়েছে। টেকসই বাঁধের নামে করা হয়েছে বালুর বাঁধ। যে কারণে বাঁধের স্থায়ীত্ব নিয়ে খুবই চিন্তায় আছি আমরা।
রায়েন্দা ইউনিয়নের রাজেশ্বর গ্রামের বাসিন্দা মো. হেলাল খান বলেন, ২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডরে বেড়িবাঁধ ভেঙে জলোচ্ছাসে আমাদের একই বাড়ির ২৬ জন লোক মারা যায়। কিন্তু চায়না ঠিকাদাররা সেই স্থানের বাঁধে কোনো সিসি ব্লক দেয়নি। বলেশ্বর নদের ঢেউয়ের আঘাতে এখনই মূল বাঁধে ভাঙন ধরেছে। আমরা আতঙ্কে আছি।
উপজেলার রায়েন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আজমল হোসেন মুক্তা বলেন, বর্ষা শুরুর আগেই বলেশ্বর নদীর ভাঙ্গন তীব্র হচ্ছে। ভাঙ্গন কবলিত এলাকায় দ্রুত ডাম্পিং না করা হলে বেড়িবাধে ধ্বস নামবে। সিইআইপি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের সমন্বয়হীনতায় বিশাল এই প্রকল্পের কাজে কোনো তদারকি হয়নি। যার ফলে চায়নারা দায়সারা কাজ করে গেছে। বলেশ্বর তীরের কমপক্ষে ১০টি পয়েন্টে নদী শাসন জরুরী হয়ে পড়েছে। তা না হলে এই বাঁধ কোনোভাবেই টেকানো যাবে না। বাঁধ হস্তান্তরের আগে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কাজের মান যাচাই করার দাবি জানাই।
এব্যাপারে জানতে চাইলে উপকূলীয় বাঁধ উন্নয়ন প্রকল্পের (সিইআইপি) খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুল আলম বলেন, আমাদের প্রকল্পে যে পরিমান কাজ করার কথা, তা শেষ হয়ে গেছে। ডিসেম্বরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ হস্তান্তর করা হবে। নদী শাসনের বিষয়ে জানতে চাইলে বলেন, যেহেতু প্রকল্পের মেয়াদ এবং কাজ শতভাগ শেষ হয়েছে। এখানে আর নতুন করে সিইআইপির কিছু করার নেই। হস্তান্তরের পর পানি উন্নয়ন বোর্ড নদী শাসনের বিষয়টি দেখবে।
অপরদিকে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাগেরহাটের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, ‘সিইআইপি’ প্রকল্পে অধিক ঝুঁকিপূর্ণ গাবতলা ও ফাসিয়াতলা এলাকায় নদী শাসনের অর্থ ধরা আছে। বর্ষা মৌসুমের আগেই দুই পক্ষের সমঝোতা স্বাক্ষরের মাধ্যমে দুই স্থানে নদী শাসন করা হবে।