বাংলাদেশের কৃষিজমির উর্বরতা দিন দিন হারিয়ে যাচ্ছে। জমির উর্বরতা হারানোর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে উঠে এসেছে পলিথিন দূষণ। শহর থেকে গ্রাম পর্যন্ত প্রতিনিয়ত যত্রতত্র ফেলে দেওয়া পলিথিন মাটির গভীরে জমে থেকে কৃষি উৎপাদনে বিরূপ প্রভাব ফেলছে। একদিকে মাটির প্রাকৃতিক গঠন ও পুষ্টি নষ্ট হচ্ছে, অন্যদিকে কৃষকের খরচ বাড়ছে ফসলের উৎপাদন কমে যাচ্ছে। ফলে এই প্রবণতা শুধু পরিবেশ নয়, খাদ্য নিরাপত্তাকেও মারাত্মক হুমকির মুখে ঠেলে দিচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, পলিথিন মাটিতে শত শত বছর ধরে অক্ষত থাকে। এটি মাটির বায়ুচলাচল বন্ধ করে দেয়, পানি প্রবাহে বাধা সৃষ্টি করে এবং মাটির উপকারী জীবাণু ও কেঁচোর মতো প্রাণীদের ধ্বংস করে। ফলে মাটির স্বাভাবিক উর্বরতা

ধিরে ধিরে নষ্ট হয়ে যায়। জমিতে নিয়মিতভাবে বর্জ্য ফেলার কারণে পলিথিন জমে গিয়ে পরবর্তীতে সেই জমি চাষাবাদের অযোগ্য হয়ে পড়ে। পলিথিনের কারণে অনেক সময় জমিতে ফাটল ধরে থাকে, পানি জমে থাকে অথবা মাটি শক্ত হয়ে যায়।
রাজধানী ঢাকার পার্শ্ববর্তী নবাবগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, সাভার, নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, শহরের আবর্জনার সঙ্গে আসা পলিথিন কৃষকদের ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি করছে। এসব এলাকার কৃষকরা অভিযোগ করছেন, ধান, সবজি বা শাক চাষ করতে গেলে মাটির নিচে পলিথিনের স্তর পাওয়া যাচ্ছে, যা চাষের যন্ত্রপাতি চালাতেও বাধা সৃষ্টি করছে। ভালোভাবে ট্রাক্টর দিয়ে পরিস্কার করলেও পলিথিন পুরোপুরি সরানো সম্ভব হচ্ছে না।
নবাবগঞ্জ উপজেলার কৃষক হাশেম আলী (৬৫) এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলেন, “আগে আমার জমিতে প্রতি মৌসুমে দুই থেকে তিনবার ফসল হতো। এখন একবারই ভালোভাবে ফসল হয় না। জমির মাটিতে আগের মত আর উর্বরতা নেই। মাটি শক্ত হয়ে যাওয়ার ফলে চারা ভালো ধরে না। আর যতই সার দিই, ফসলের ফলন ভালো হয় না। মাটি খুড়লেই প্রায় জায়গায় পলিথিনের দেখা মিলছে। কেরানীগঞ্জের কৃষক মহিবুল ইসলাম (৪৫) এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলেন, আমরা এখন জমি চাষ করতে গেলে মাটির নিচে পলিথিনের অস্তরন দেখতে পাই। আর এই পলিথিনের কারণে আমাদের ফসলি জমিতে আগের মত আর ফসল উৎপাদন হচ্ছে না।
স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলেন, পলিথিনের কারণে পরিবেশের মারত্মক ক্ষতি হচ্ছে। প্রতি বছর দেশের হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি পলিথিন দূষণের ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কৃষকেরা জানতেও পারছেন না জমির ফলন কেন কমছে কারণ পলিথিন জমির নিচে লুকিয়ে থাকে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিস্তার করে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. দিদার উল আলম এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলেন, “পলিথিন একটি সিনথেটিক উপাদান। এটি প্রাকৃতিকভাবে সহজে নষ্ট হয় না। একবার মাটির নিচে গেলে তা শত বছরেও মিশে না। এর ফলে মাটি তার স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা হারায়। উদ্ভিদের শিকড় ঠিকভাবে বিস্তার করতে পারেনা। এখনই পলিথিনের ব্যবহার বন্ধ না করলে ভবিষ্যতে কৃষিজমির মৃত্যু ঘটবে। কোন ফসলই ভালোভাবে হবে না।
২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার পরিবেশ সংরক্ষণ আইন অনুসারে পলিথিন ব্যাগ উৎপাদন, ব্যবহার ও বাজারজাতকরণ নিষিদ্ধ করে। কিন্তু বাস্তবে এই আইনের কোন কার্যকারীতা দেখা যায় না। এখনও বাজার, মুদি দোকান, এমনকি ফল ও সবজির হাটে পলিথিনের ব্যাগ ব্যবহার হচ্ছে নির্দ্বিধায়।
একটি পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিষিদ্ধ হয়েও প্রতিদিন দেশে প্রায় ৩০০-৪০০ টন পলিথিন ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশ্বব্যাংকের পরিসংখ্যান অনুযায়ী রাজধানীর ৬৪ শতাংশ মানুষ পলিথিন ব্যাগ ব্যবহার করে। তার মধ্যে শুধু ঢাকা শহরে প্রতিদিন প্রায় আড়াই কোটিরও বেশি পলিথিন ব্যাগ একবার ব্যবহার করে বাইরে ফেলে দেওয়া হয়। অপচনশীল ও সর্বনাশা পলিথিনের এমন যথেচ্ছ ব্যবহারের ফলে বিশেষ করে বর্ষাকালে নগর-মহানগরে পয়োনিষ্কাশনের ড্রেন, নালা, নর্দমা, খাল, বিল ও নদীগুলো ভরাট হওয়ার পাশাপাশি ফসলি জমির ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।
পরিবেশবাদী সংগঠনগুনের কর্মী শরিফুল ইসলাম এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলেন, পলিথিন নিষিদ্ধ হলেও সচেতনতা, বিকল্পের অভাব ও কার্যকর নজরদারির অভাবে এর ব্যবহার কমছে না। শহরের আবর্জনা সংগ্রহের সময়ও পলিথিন আলাদা করে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য হিসেবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না, বরং তা একসঙ্গে মাটিচাপা দেওয়া হয়। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে সেটি মাটির নিচে থেকে কৃষিজমির ব্যাপক ক্ষতি করছে।
এ বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তা সাদিকুল ইসলাম এটিএন বাংলা অনলাইনকে বলেন, “আমরা পলিথিনবিরোধী অভিযান চালাচ্ছি। তবে পলিথিন ব্যবহারে জনগণের মাঝে এখনও পর্যাপ্ত সচেতনতা আসেনি। সবাই সচেতন হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় প্রশাসন এটিকে আরো বেশি গুরুত্ব দিলে পলিথিনের ব্যবহার কমে আসবে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, শুধু আইন থাকলেই হবে না, তার প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একইসঙ্গে প্রয়োজন ব্যাপক গণসচেতনতা এবং পলিথিনের বিকল্প সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী করে তোলা। পাট বা কাপড়ের ব্যাগ ব্যবহারে জনগণকে উৎসাহিত করতে হবে। কৃষিজমির সংরক্ষণের জন্য বিশেষ কার্যক্রম গ্রহণ, পলিথিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং স্কুল-কলেজে পরিবেশ শিক্ষা জোরদার করলে পলিথিনের মারত্মক ক্ষতি বা দূষণ থেকে পরিবেশকে রক্ষা করা যাবে।