
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
বাংলাদেশ ইতিহাস গবেষণা সমিতি'র আয়োজনে ‘১৯০৫ সালের বঙ্গবিভাগ ও মুসলিম জাগরণ’ শীর্ষক এক সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। সেমিনারে বক্তারা ১৯০৫ সালের বঙ্গবিভাগকে পূর্ব বাংলার অনগ্রসর জনপদের জাগরণ ও অধিকার সচেতনতার এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক মাইলফলক হিসেবে মূল্যায়ন করেন।
গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার বিকেলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চতর মানববিদ্যা গবেষণা কেন্দ্রের ‘মমতাজুর রহমান তরফদার’ সভাকক্ষে এই সেমিনারটি অনুষ্ঠিত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন নবগঠিত ইতিহাস গবেষণা সমিতির প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. মো. আলমগীর।
অনুষ্ঠানের শুরুতে আগত অতিথিদের হাতে সেমিনার উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকাটি তুলে দেওয়া হয়, যাতে মূল প্রবন্ধ ছাড়াও দেশি-বিদেশি গবেষকদের লেখা ১২টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। এরপর স্বাগত বক্তব্য রাখেন সাবেক রাষ্ট্রদূত ও সরকারের সচিব মসউদ মান্নান, এনডিসি।
সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিএইচডি গবেষক জান্নাতে গুলশান। তাঁর প্রবন্ধের শিরোনাম ছিল—‘১৯০৫ সালের প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস: পূর্ব বাংলার মুসলিম ও তফসিলী হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতিক্রিয়া’। তিনি তাঁর প্রবন্ধে কোন্ প্রেক্ষাপটে পূর্ব বাংলার মুসলিম ও দলিত শ্রেণির হিন্দুরা ১৯০৫ সালে ব্রিটিশ সরকারের সৃষ্ট বঙ্গবিভাগ সমর্থন করেছিল এবং সেই সমর্থন কতটা যুক্তিসঙ্গত ছিল তা তুলে ধরেন। পাশাপাশি বঙ্গবিভাগের বিরোধিতাকারী হিন্দু ও হিন্দু ঘেঁষা লেখকেরা এতকাল যে সাম্প্রদায়িকতার চোখে একপেশেভাবে মূল্যায়ন করে এসেছে, তা তিনি মৌলিক তথ্য ও উপাত্ত দ্বারা প্রমাণ করেন।
প্রধান আলোচক হিসেবে বক্তব্য রাখেন বিশিষ্ট কলামিস্ট, লেখক ও গবেষক মনোয়ার শামসী সাখাওয়াত। তিনি বলেন, ১৯০৫ সালের বঙ্গবিভাগের ফলে ঢাকা নতুন প্রদেশের রাজধানীর মর্যাদা পাওয়ায় ঢাকা শহর ও পূর্ব বাংলার যে উন্নতি হয়েছিল, তার সুফল আজো আমরা ভোগ করছি। সেই বঙ্গবিভাগ ও তা রদের পরিপ্রেক্ষিতে মুসলিমদের দাবির কারণে ব্রিটিশ সরকার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে বাধ্য হয়েছিল। যদিও হিন্দুরা তাতেও বাঁধ সেধেছিল, কিন্তু এদেশের মুসলিমদের সাথে হিন্দুরাও সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের সুবিধা ভোগ করে আসছে। তিনি আরও বলেন, ১৯০৫ সালে বঙ্গভঙ্গের মধ্যদিয়ে কলকাতার আধিপত্য ভাঙ্গার সূচনা হয়, এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৭ এর পরিবর্তন এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম হয়। কিন্তু আমরা ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের কথা বার বার বললেও ১৮৫৭ সালের আযাদির কথা চেপে যাই। কিন্তু ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তান না হলে কি কখনো বাংলাদেশ স্বাধীন হতো? তিনি প্রবন্ধকার জান্নাতে গুলশানকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন যে এই প্রবন্ধের মাধ্যমে বঙ্গভঙ্গের ইতিহাস এক নয়া অভিমুখে যাত্রা করল। ঐতিহাসিকদের একপেশে মনোভাবের কারণে এদেশের ইতিহাস তার নিজস্ব গতিতে চলতে পারে নি। এখন সময় এসেছে প্রকৃত ইতিহাস অন্বেষণ করে সেটা দেশবাসীর নিকট তুলে ধরা।
প্রধান অতিথির ভাষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. শরীফ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ১৯০৫ সালের বঙ্গবিভাগের কথা বহুবার চর্চিত হয়েছে এবং এর ওপর বহু পুস্তকও রচিত হয়েছে। এতদিন ভাবা হতো এই প্রসঙ্গের কবর রচিত হয়ে গেছে এবং এ নিয়ে আর কিছু বলার নেই, কিন্তু আজ ড. জান্নাতে গুলশানের উপস্থাপিত প্রবন্ধে এমন কিছু মৌলিক ও অজানা তথ্য উঠে এসেছে যা থেকে বুঝা যাচ্ছে এই প্রসঙ্গে এখনো অনেক কিছুই জানার ও বলার বাকী আছে। তিনি গবেষকদের উদ্দেশে আরও বলেন, এই প্রসঙ্গে নতুন কিছু বলতে হলে দেশ-বিদেশের আর্কাইভস থেকে আরও বেশ কিছু মৌলিক তথ্য সংগ্রহ করতে হবে এবং সাহস নিয়ে তা সুধী সমাজের সামনে উপস্থাপন করতে হবে, কারণ এবিষয়ে বিরোধিতা করে কথা বলার প্রবল প্রতিপক্ষ রয়েছে যারা ছেড়ে কথা বলবেন না। তবে তিনি আশা প্রকাশ করেন, নবগঠিত ইতিহাস গবেষণা সমিতি যে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়েছে তা একদিন সফল হবে।
সভাপতির বক্তব্যে প্রফেসর ড. মো. আলমগীর বলেন, বাংলা ও ভারতসহ এতদঞ্চলের ইতিহাস ও ঐতিহ্য সঠিকভাবে বর্তমান প্রজন্মের নিকট তুলে ধরার জন্য এই ইতিহাস গবেষণা সমিতি গঠিত হয়েছে। সমিতি এর আগে ইন্টারনেটের মাধ্যমে দেশি-বিদেশি গবেষক ও প্রফেসরদের নিয়ে অনেকগুলো ওয়েবিনার আয়োজন করলেও আজই প্রথম তাদের প্রকাশ্য সেমিনার অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আজকের সেমিনারের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই বিষয়ে নতুন ও মৌলিক কিছু তথ্য উপস্থাপিত হয়েছে , যা এতদিন কেউ সাহস করে বলেননি। সংশ্লিষ্ট সকলের সহযোগিতা পেলে তারা কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবেন বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ঢাকা নওয়াব স্যার সলিমুল্লাহ মেমোরিয়াল ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট রুহী শামসাদ আরা। পরিশেষে সমিতির যুগ্ম সচিব আব্দুল্লাহ আল মাহমুদের ধন্যবাদ জ্ঞাপনের মাধ্যমে সেমিনারের সমাপ্তি ঘটে।