
এটিএন বাংলা, ওয়াসা ভবন, ২য় তলা, ৯৮ কাজী নজরুল ইসলাম এভিনিউ, কাওরান বাজার, ঢাকা-১২১৫, বাংলাদেশ
ফোনঃ +88-02-55011931
এ সম্পর্কিত আরও খবর
ঢাকার কাফরুলে ময়লার ব্যবসা, ফুটপাত দখল এবং চাঁদাবাজিকে কেন্দ্র করে সংঘটিত হত্যাকাণ্ডে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে ইনস্টিটিউট ফর প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (আইপিডি)। সংস্থাটি বলেছে, এ ঘটনা আবারও প্রমাণ করেছে যে নগরের সেবা ও ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন খাতে অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ এবং রাজনৈতিক প্রভাবের বিপজ্জনক যোগসূত্র এখনও বহাল রয়েছে।
সোমবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইপিডি জানায়, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বক্তব্যে এ ঘটনার পেছনে নগরসেবাকেন্দ্রিক অবৈধ অর্থনৈতিক স্বার্থ, রাজনৈতিক প্রভাব এবং স্থানীয় আধিপত্যের বিষয়টি উঠে এসেছে। সংস্থাটির মতে, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা নগরভিত্তিক অবৈধ অর্থনীতি ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতার বাস্তবতারই বহিঃপ্রকাশ।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, দেশের রাজনীতিতে এখনও এমন
সংস্থাটি জানায়, ময়লা সংগ্রহ, ফুটপাত, বাজার, পরিবহন, মাঠ-পার্ক, খাল-জলাশয় ও জমি দখলসহ বিভিন্ন নগরসেবাকে কেন্দ্র করে একটি সমান্তরাল অবৈধ অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে উঠেছে। এই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে রাজনৈতিক বলয়ের অভ্যন্তরেও সংঘাত, সহিংসতা ও হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে।
ঢাকার ময়লা ব্যবস্থাপনাকে ঘিরে গড়ে ওঠা বাণিজ্যিক কাঠামোর সমালোচনা করে আইপিডি জানায়, নাগরিকরা নিয়মিত হোল্ডিং ট্যাক্স পরিশোধ করলেও তাদের কাছ থেকে আলাদাভাবে ময়লা অপসারণের জন্য অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হয়। বিষয়টি নিয়ে আদালতে রিটও হয়েছে। সংস্থাটির মতে, এই অস্বচ্ছ ও অনিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থা চাঁদাবাজি ও অবৈধ আর্থিক লেনদেনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। সিটি কর্পোরেশন চাইলে আধুনিক ও স্বচ্ছ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুরো ময়লা সংগ্রহ ও অপসারণ কার্যক্রম নিজেদের নিয়ন্ত্রণে এনে রাজস্ব বৃদ্ধি এবং অবৈধ মধ্যস্বত্বভোগী চক্রের অবসান ঘটাতে পারে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ফুটপাত, সরকারি জমি, খাল, জলাশয়, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান দখল করে অবৈধ ব্যবসার মাধ্যমে একটি শক্তিশালী নগর মাফিয়াতন্ত্র গড়ে উঠেছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও পেশিশক্তির কারণে এই দখলদারিত্ব বছরের পর বছর টিকে থাকায় নাগরিকদের চলাচল, পরিবেশ ও জীবনমান ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে এবং পরিকল্পিত নগর উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
আইপিডির মতে, সিটি কর্পোরেশনগুলোতে দীর্ঘদিন নির্বাচিত কাউন্সিলর বা জনপ্রতিনিধির অনুপস্থিতি এবং দলীয়ভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রশাসকদের মাধ্যমে স্থানীয় প্রশাসন পরিচালিত হওয়ায় জবাবদিহিতা দুর্বল হয়েছে। এর ফলে স্থানীয় পর্যায়ে বিভিন্ন অবৈধ গোষ্ঠী আরও শক্তিশালী হওয়ার সুযোগ পেয়েছে। শক্তিশালী, জবাবদিহিমূলক ও গণতান্ত্রিক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা ছাড়া নগর ব্যবস্থাপনায় সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয় বলেও উল্লেখ করা হয়।
কাফরুলের হত্যাকাণ্ডের মতো ঘটনা প্রতিরোধে কেবল আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান যথেষ্ট নয় বলে মনে করে আইপিডি। সংস্থাটির ভাষ্য, এ ধরনের সংঘাতের অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি ভেঙে দিতে হবে। অবৈধ অর্থনীতির উৎস বন্ধ না হলে ব্যক্তি পরিবর্তিত হলেও সহিংসতার চক্র অব্যাহত থাকবে।
এ প্রেক্ষাপটে সরকারের প্রতি সাত দফা সুপারিশ তুলে ধরেছে আইপিডি। এর মধ্যে রয়েছে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদাবাজি, দখলদারিত্ব ও অবৈধ বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা; রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে জড়িত সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া; ময়লা সংগ্রহ ব্যবস্থাকে পুরোপুরি সিটি কর্পোরেশনের আওতায় আনা; নাগরিকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় বন্ধ করা; ফুটপাত, সরকারি জমি, খাল, জলাশয়, পার্ক ও উন্মুক্ত স্থান দখলমুক্ত করতে নিয়মিত ও নিরপেক্ষ অভিযান পরিচালনা; নগরসেবাভিত্তিক সব ইজারা, চুক্তি ও আর্থিক লেনদেনে স্বচ্ছতা নিশ্চিত ও ডিজিটাল নজরদারি চালু; সিটি কর্পোরেশনে দ্রুত নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং নগর ব্যবস্থাপনায় বিদ্যমান অবৈধ অর্থনীতি নির্মূলে সমন্বিত জাতীয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে আইপিডি দৃঢ়ভাবে উল্লেখ করেছে, নগরসেবাকে ঘিরে গড়ে ওঠা অবৈধ অর্থনীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারিত্বের অবসানে আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ, কার্যকর স্থানীয় সরকার, স্বচ্ছ নগর ব্যবস্থাপনা এবং রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় নগরের বিভিন্ন সেবা ও সম্পদ দখলকে কেন্দ্র করে সংঘাত, সহিংসতা ও প্রাণহানির পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।
/টি