logo

বৈভব সূর্যবংশী

বৈভব সূর্যবংশীর উত্থানের অদম্য গল্প - image

বৈভব সূর্যবংশীর উত্থানের অদম্য গল্প

15 ফেব্রুয়ারি 2026, বিকাল 10:58

পাটনা: সুখদেও নারায়ণ আন্তঃস্কুল টুর্নামেন্টের জন্য নাম লেখানো শুরু হলেই সমস্তিপুর থেকে প্রায় ৯০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিত এক ছোট্ট ছেলে। কখনও সাইকেলে চড়ে, কখনও অন্য উপায়ে—শুধু ফর্ম সংগ্রহের জন্য। বিহারের মাটিতে উচ্চাকাঙ্ক্ষা যেখানে সম্পদের চেয়েও বড়, সেই দৃশ্য বহু মানুষের মনে দাগ কেটেছিল।রঞ্জি ট্রফির ক্রিকেটার ও কোচ মনীশ ওঝা খুব দ্রুতই এই গল্পের সঙ্গে পরিচিত হন। বহু বছর পর একদিন সেই ছেলেটিই, বড় হয়ে, হাজির হন তার দরজায়। নিজের জন্য নয়, আট বছরের ছেলে বৈভব সূর্যবংশীর জন্য।ততদিনে সঞ্জীব সূর্যবংশীর ত্যাগের কথা ক্রিকেট মহলে ছড়িয়ে পড়েছে। ঋণের বোঝা বাড়তে থাকে, ছেলের ক্রিকেট প্রশিক্ষণের খরচ জোগাতে বিক্রি হয়ে যায় কৃষিজমি। ভোর ৪টায় শুরু হত দিন। স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে সমস্তিপুর থেকে পাটনা—প্রথমে বাস, তারপর গাড়ি। সঙ্গে থাকত আরও কয়েকজন কিশোর বোলার, যারা নেটে পালা করে বল করত। শুধু বৈভবের জন্য নয়, সবার জন্যই টিফিনের ব্যবস্থা থাকত।তখন আনিসাবাদের ছোট্ট জায়গায় অবস্থিত ওঝার একাডেমিতে দিনভর থাকতেন সঞ্জীব। একের পর এক বোলার ক্লান্ত হলে অন্যজন আসত, আর বৈভব ব্যাট চালিয়ে যেত—৫০০ বল, কখনও তারও বেশি। যেদিন পাটনা যাওয়া হত না, সেদিন সমস্তিপুরে বাড়ির বারান্দায় চলত অনুশীলন।শুরুর দিকে ওঝা সতর্ক ছিলেন। “বিলকুল হি বাচ্চা থা। আগর জ্যাদা তেজ ডাল দেতে, লাগ সক্ত থা,” স্মরণ করেন তিনি। তাই আন্ডারআর্ম ফুল টস, হাতে আলতো করে সিন্থেটিক বল—এইভাবেই শুরু। “এই বয়সে সম্ভাবনা বিচার করা খুব কঠিন,” বলেন তিনি।ছয়-আট মাস পর একদিন ওঝা কৌতূহলবশত রোবো আর্মে ১৩০-১৩৫ কিমি গতিতে বল সেট করেন। আচমকাই বৈভব সেই গতির সঙ্গে মানিয়ে নেয়। “এটা আমার জন্যও বড় আশ্চর্যের বিষয় ছিল,” স্বীকার করেন ওঝা।সম্পাটচকের নতুন একাডেমি মাঠে একদিন রাজ্য অনূর্ধ্ব-১৯ ক্রিকেটারের বিপক্ষে জীর্ণ উইকেটে ব্যাট করতে নেমে বৈভব অপরাজিত থাকেন। পরে এক অনুশীলন ম্যাচে, যেখানে প্রতিপক্ষ দলে ছিলেন অনূর্ধ্ব-১৯ ও অনূর্ধ্ব-২৩ পর্যায়ের পেসার-স্পিনাররা, জেলা ক্রিকেটও না-খেলা বৈভব করেন ১১৮ রান। “ছক্কার কোনওটিই ৮০-৮৫ মিটারের নিচে ছিল না,” জানান ওঝা।ইনিংস শেষে সঞ্জীবকে তিনি বলেন, “তোমার ছেলে বড় ক্রিকেটের জন্য প্রস্তুত।” সেই মুহূর্তেই দূর হয় সব সংশয়।তবে কোচ হিসেবে ওঝা চেয়েছিলেন বৈভব দীর্ঘক্ষণ ব্যাট করতে শিখুক, শুধু বাউন্ডারির ওপর নির্ভর না করুক। তাই সিমেন্টের উইকেটে জল ঢেলে স্কিড বাড়ানো, নতুন বলে দুই পেসারকে একসঙ্গে আক্রমণে নামানো, কখনও বালি-নুড়ি ছড়িয়ে অপ্রত্যাশিত টার্ন তৈরি—সবই ছিল ধৈর্যের পরীক্ষা। কিন্তু বৈভবের ব্যাট থামেনি।একদিন বিশেষ আক্রমণাত্মক ইনিংসের পর ওঝা প্রশ্ন করেন, কেন নির্দেশ না থাকলেও এত আক্রমণ? জবাব আসে, “যে বল কো ছক্কা মার সক্তে হ্যায়, সিঙ্গেল ডাবল কিউ লেইন?” এরপর থেকেই ওঝা আর তার আগ্রাসন থামাতে চাননি।ওঝার মতে, বৈভব খুব কম কথা বলত, প্রশ্নও করত না। “আমি যা বলতাম, সে তা-ই করত। একবার ব্যাখ্যা করো, যথেষ্ট।” ফিল্ডিং বা ফিটনেস ড্রিল এড়াতে কখনও বলত, “পেট মে দরদ হো রাহা হ্যায়।” উত্তরে ওঝার জবাব, “ব্যাটিং করো, পেটের ব্যথা চলে যাবে।”ক্রমে ক্রিকেটই তার হয়ে কথা বলতে শুরু করে। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে যুব টেস্টে অভিষেকে সেঞ্চুরি, ১৪ বছর বয়সে আইপিএল চুক্তি, প্রথম বলেই ছক্কা—সব মিলিয়ে দ্রুত উত্থান।আইপিএলে রাজস্থান রয়্যালস-এর হয়ে খেলে আলোড়ন তোলেন বৈভব। গুজরাট টাইটান্স-এর বিপক্ষে করেন ৩৮ বলে ১০১ রান। সেঞ্চুরির পর ফ্র্যাঞ্চাইজির এক ভিডিওতে যখন জিজ্ঞাসা করা হয়, কাকে প্রথম ফোন করবেন, জবাব ছিল স্পষ্ট—“পাপা কো হি কারুঙ্গা।”ফোনে সংযোগ হতেই স্টেডিয়ামের কোলাহল পেরিয়ে নরম কণ্ঠে শোনা যায়, “পাপা পরনাম।” বিহারের উচ্চারণে ‘প্রণাম’ হয়ে যায় ‘পরনাম’—সেই শব্দে মিশে থাকে ছোট ছোট শহর থেকে শুরু করে বিশ্বমঞ্চে পৌঁছে যাওয়ার দীর্ঘ যাত্রার স্মৃতি।সমস্তিপুর থেকে শুরু হওয়া সেই পথচলা আজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের আলোয়। আর তার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়ে গেছেন এক বাবা, এক কোচ এবং এক অদম্য কিশোর—বৈভব সূর্যবংশী।প্রত্যুষ সিনহা (ক্রিকবাজ থেকে)/টিএ

ফেব্রুয়ারি ১৫, ২০২৬
footer small logo

Design & Developed by:

developed-company-logo