কোটিপতি বাসিন্দা

বাংলাদেশ

ইয়াবা ব্যবসার মূল কেন্দ্র কক্সবাজারের টেকনাফ। এখান থেকেই সারা দেশে ছড়িয়ে দেওয়া হয় সর্বনাশা এই মাদক। ব্যবসাটা চলে এভাবে-ঢাকা থেকে মুঠোফোনে খুদে বার্তা পাঠানো হয় টেকনাফের বিশেষ একজনকে। জানাতে হয় কী পরিমাণ ইয়াবা লাগবে, কোথায় পাঠাতে হবে। ইয়াবা চলে যায় সেই ঠিকানায়। আর টাকা পাঠানোও এখন তো অনেক সহজ। ব্যাংক হিসাব তো আছেই, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তা এখন আরও সহজ। দ্রুত টাকা চলে যায় সেখানে। আর এভাবেই টেকনাফ থেকে প্রতিনিয়ত ইয়াবার চালান ছড়িয়ে পড়ছে ঢাকাসহ সারা দেশে।

আর্থিক, সামাজিক, মানবিক—নানাভাবে মাদক ইয়াবার আগ্রাসন দেশজুড়ে। বছরে এই বড়ি বিক্রি হচ্ছে ৪০ কোটির মতো, যার বাজারমূল্য প্রায় ছয় হাজার কোটি টাকা (প্রতিটি দেড় শ টাকা দাম হিসেবে)। এই টাকার অর্ধেকই চলে যাচ্ছে ইয়াবার উৎসভূমি মিয়ানমারে। মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা পাচার শুরু হয় ২০০৬ সাল থেকে। কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের ঠিক ওপারেই মিয়ানমারের অবস্থানের কারণে এই স্থানটিই ইয়াবা আসার প্রধান রুট হিসেবে ব্যবহার হয়ে আসছে। ফলে টেকনাফের বিভিন্ন এলাকা জুড়েই চলছে ইয়াবার জমজমাট ব্যবসা। রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা পেয়ে এর মূল ব্যবসায়ীরাও থেকে যাচ্ছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

মৌলভীপাড়া ও নাজিরপাড়া এ রকমই দুটি গ্রাম। টেকনাফ শহর থেকে দক্ষিণে শাহপরীর দ্বীপের দিকে যেতে পাশাপাশি এই দুই গ্রাম। এলাকার মানুষের কাছে গ্রাম দুটি ‘ইয়াবা গ্রাম’ বলে পরিচিত। এই গ্রামের অনেক বাসিন্দা কয়েক বছর আগেও ছিলেন জেলে, রিকশাচালক, বেকার যুবক, পিঠা বিক্রেতা, কৃষক বা ক্ষুদ্র লবণচাষি। তাঁদের বড় অংশই এখন সচ্ছল, কেউ কেউ কোটিপতি, গাড়ি হাঁকিয়ে চলেন। গ্রামের রাস্তার দুপাশে সব সুরম্য বাড়িঘর।

ধারণা করা হচ্ছে, দেশে বছরে ৬ হাজার কোটি টাকার ইয়াবা বাণিজ্য হয়। কত হাজার লোক জড়িত, তার কোনো হিসাব নেই। এর মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (বিএফআইইউ) অনুসন্ধানে টেকনাফ ও ঢাকার এমন ১৮ জন ইয়াবা ব্যবসায়ীর ২৬ কোটি টাকা লেনদেনের হদিস পাওয়া গেছে। মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ২৫০টি হিসাব ও প্রচলিত ব্যাংকিংয়ের ১৯টি হিসাবের মাধ্যমে এই অর্থ লেনদেন করা হয়েছে।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এই ১৮ জনসহ ২৪ জনকে গ্রেপ্তার করেছে। ইয়াবার টাকা লেনদেনে ব্যবহার করা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের ২৫০টি সিম এবং প্রচলিত ব্যাংকের ১৯টি হিসাবের সব লেনদেন স্থগিত করা হয়েছে বলে জানান এ-সংক্রান্ত তিনটি মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার নাজিম উদ্দিন আল আজাত।

সিআইডির সংঘবদ্ধ অপরাধ প্রতিরোধ দলের বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, এই মাদক ব্যবসায়ীরা বছরের পর বছর ধরে শত শত কোটি টাকার ইয়াবা ব্যবসা করছেন। অনুসন্ধানে যেসব তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেছে, তা এঁদের ব্যবসার তুলনায় খুবই সামান্য। মাদক বিক্রি করে তাঁরা কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ গড়ে তুলেছেন। মাদক ব্যবসায়ীদের এসব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার আবেদন করা হয়েছে আদালতে।

সরেজমিন ‘ইয়াবা গ্রাম’

টেকনাফের মৌলভীপাড়া ও নাজিরপাড়া গ্রাম। নাজিরপাড়া গ্রামের বাসিন্দা এজাহার মিয়ার ছেলে নূরুল হক ওরফে ভুট্টো। একটি রিকশা কেনার সামর্থ্য ছিল না নূরুল হকের, বসতবাড়ি বলতে ছিল গোলপাতার একটি ঘর। সেই নূরুল হক এখন নাজিরপাড়ার দুটি বাড়ির মালিক। এর বাইরে চট্টগ্রাম ও খুলনায় তাঁর ফ্ল্যাট আছে। আছে তিনটি গাড়িও। জমিজমাও কিনেছেন অনেক। নাজিরপাড়ায় রাস্তার পাশে এখন একটি মার্কেটও নির্মাণ করছেন।

টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মাইন উদ্দিন খান প্রথম আলোকে বলেন, নূরুল হক মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত। তাঁর বিরুদ্ধে ৯টি মামলা আছে।

এলাকার বাসিন্দারা জানিয়েছেন, নূরুল হকের দৃশ্যত কোনো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নেই। কিন্তু আল–আরাফাহ্‌ ইসলামী ব্যাংকের টেকনাফ শাখায় গত এক বছরে তিনি ৫৭ লাখ ৬৬ হাজার টাকা লেনদেন করেছেন। এর আগের এক বছরে টেকনাফের অগ্রণী ব্যাংকে লেনদেন করেছেন আরও ২৯ লাখ ৪৩ হাজার টাকা। ২০১৩ সালে জনতা ব্যাংকে লেনদেন করেছেন ৮ লাখ টাকা। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এসব টাকা টেকনাফের বাইরে বিভিন্ন স্থান থেকে তাঁর হিসাবে জমা করা হয়েছে।

টেকনাফ শাখা আল-আরাফাহ ব্যাংকের ব্যবস্থাপক ফখরুল আলম ভূইয়া প্রথম আলোকে বলেন, ব্যাংকের নথিতে নূরুল হক নিজের পেশা ‘ব্যবসা’ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি শুনেছেন, তাঁর লবণের ব্যবসা এবং সীমান্তে গরু কেনাবেচার কারবার আছে। সিআইডির কর্মকর্তারা এসব ব্যবসার ব্যাপারে খোঁজ-খবর করেছেন বলে ব্যাংক কর্মকর্তা জানান।

এ যেন পারিবারিক ব্যবসা

নূরুল হক শুধু একা ইয়াবা ব্যবসা করেন না। তাঁর সঙ্গে আছেন তাঁর পিতা এজাহার মিয়া, ভাই নুর মোহাম্মদ ওরফে মংগ্রী, ভগ্নিপতি নূরুল আলম, ভাগিনা জালাল উদ্দিন, বেলাল, আবছার উদ্দিন, হেলাল, হোছেন কামাল ও নুরুল আমিন ওরফে খোকন। তাঁরা সবাই ইয়াবা মামলার আসামি। সবার নামে আলাদা ব্যাংক হিসাব থাকলেও সেই সব হিসাবে নূরুল হকের টাকা লেনদেন হয়।

সিআইডির সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার নাজিম উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে নিয়োগপ্রাপ্ত এজেন্টদের মাধ্যমে ২৫০টি মোবাইল নম্বর ব্যবহার করে টেকনাফে নূরুল হকের কাছে টাকা পাঠাতেন শেওড়াপাড়ার আফজাল হোসেন ওরফে ইমন ও তাঁর ছেলে মিরপুর বাঙলা কলেজের ছাত্র সালাউদ্দিন প্রিন্স। এরপর টেকনাফ থেকে বিভিন্ন যানবাহনে তাঁদের ইয়াবা চলে আসত ঢাকায়। এই চক্রের ১৪ লাখ টাকা লেনদেনর প্রমাণ পাওয়া গেছে। শেওড়াপাড়ার ভিশন টেলিকমের কর্ণধার স্বপনের মাধ্যমে এই টাকা পাঠানো হতো।

পল্লবীর বিকাশ এজেন্ট আবদুর রহিম ওরফে জনির মাধ্যমে নূরুল হকের কাছে ইয়াবা কেনার টাকা পাঠাতেন পল্লবীর আলামিন ও তাঁর স্ত্রী স্বরূপা ইসলাম। এরা সবাই এখন কারাগারে। আলামিন ও তাঁর স্ত্রী স্বরূপা পুরো মিরপুর ও পল্লবীতে ইয়াবার ব্যবসা করতেন। তাঁদের মধ্যে ৫০ লাখ টাকা লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে সিআইডি।

নূরুল হকের ভাই নূর মোহাম্মদের নামে যে তিনটি ব্যাংক হিসাব আছে, তাতে ২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা লেনদেনের হদিস পাওয়া গেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের টেকনাফ শাখা থেকে।

টেকনাফ ইসলামী ব্যাংকের ব্যবস্থাপক নাজমুল হক প্রথম আলোর কাছে এসব লেনদেনের কথা স্বীকার করে বলেন, সব কাগজপত্র সিআইডির কর্মকর্তারা নিয়ে গেছেন।

ব্যাংক কর্মকর্তারা জানান, নূরুল হকের পিতা এজাহার মিয়ার নামে দুটি ব্যাংকে যে হিসাব খোলা আছে, তাতে চার মাসে লেনদেন হয়েছে ৭০ লাখ টাকা। অথচ এই বৃদ্ধ বাড়িতে বসে থাকা ছাড়া কিছুই করতে পারেন না।

এসব ব্যাংক হিসাব ছাড়াও টেকনাফ বাজারের স্টার ফার্মেসির মালিক আবদুর রহমান, মোবাইল গ্যালারির মালিক নুরুল মোস্তফা, হাসান অ্যান্ড ব্রাদার্সের মালিক মোহাম্মদ হাসান, মোবাইল ব্যাংকিংয়ের এজেন্ট মোহাম্মদ তৈয়ব, মোজাহার স্টোরের মোজাহার আলম ও আবু তাহেরের মাধ্যমে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে কোটি কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে। তাঁদের লেনদেনের কাগজপত্রও সিআইডি জব্দ করেছে।

সিআইডির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ২০১৪ সালের আগে মাদক ব্যবসায়ীরা ব্যাংকের মাধ্যমে অথবা নগদ অর্থ লেনদেন করতেন। এরপর তাঁরা মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে লেনদেন করে ইয়াবা কেনাবেচা শুরু করেন।

সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিনহাজুল ইসলাম বলেন, ইয়াবার অর্থ লেনদেনে যেসব মোবাইল ব্যাংকিং নম্বর পাওয়া গেছে, সেগুলোর মধ্যে ২৫০টি এরই মধ্যে আদালতের অনুমতি নিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

আরও লেনদেন

টেকনাফের নাজিরপাড়ার নুরুল ইসলামের ছেলে নুরুল আলম ভালো ফুটবল খেলতেন। আর্জেন্টাইন ফুটবলারের নাম অনুসারে লোকে তাঁকে ডাকতেন ডি মারিয়া বলে। সাত-আট বছর আগেও নুরুল আলম রিকশা চালাতেন। এখন ইয়াবার কারবার করেন। ২০১৬ সাল থেকে দুই বছরে তাঁর ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে ১১ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। নুরুল আলম এখন কারাগারে। তাঁর ভাই ফরিদুল আলমের ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে দেড় কোটি টাকা। ফরিদ আলমকে নারায়ণগঞ্জের দুটি ইয়াবার মামলায় আটক করা হলে তিনি জামিনে ছাড়া পান। নুরুল আলমের সঙ্গী আকতার কামালও কম নন। তাঁর তিনটি ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে দেড় কোটি টাকা।

টেকনাফের আরেক ইয়াবা ব্যবসায়ী জিয়াউর রহমান নয়-দশ বছর আগেও ছিলেন বেকার। মৌলভীপাড়ার চোরাচালানের ঘাট নিয়ন্ত্রণকারী হিসেবে পরিচিতি পাওয়ার পর ইয়াবা পাচার শুরু করেন। এখন দুটি মাইক্রোবাস ও চারটি ভারতীয় বিভিন্ন মডেলের দ্রুতগামী মোটরসাইকেলের মালিক। একটি আলিশান বাড়িও বানিয়েছেন। তাঁর ছোট ভাই আবদুর রহমান ও কামাল হোসেন ইয়াবা ব্যবসায় সক্রিয়। আবদুর রহমানের তিনটি ব্যাংক হিসাবে লেনদেন হয়েছে ৭ কোটি ৭১ লাখ টাকা। দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মাদক ব্যবসায়ীরা এসব অর্থ জমা দিয়েছেন। আরেক ভাই কামাল হোসেনের হিসাবেও ১ কোটি টাকা লেনদেন হয়েছে।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ব্যাংক হিসাবে জমা দেওয়া টাকা এসেছে ঢাকার যাত্রাবাড়ী, গাজীপুর, আখাউড়া, ব্রাহ্মণবাড়িয়া ও রাজশাহী থেকে। ওই সব এলাকার মাদক ব্যবসায়ীরা ইয়াবার দাম হিসেবে এসব অর্থ জমা করেছেন। এই তথ্য জানিয়ে সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার মোল্লা নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ইয়াবা কেনার জন্য ব্যাংকে টাকা জমা দিয়েছেন এমন অন্তত ২০০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাঁদের পর্যায়ক্রমে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান কাজী রিয়াজুল হক প্রথম আলোকে বলেন, ইয়াবা এখন আমাদের জাতীয় শত্রুতে পরিণত হয়েছে। এই নেশার বড়ি যুব সমাজকে চিরতরে শেষ করে দিচ্ছে। যারা এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত, যারা তাদের সহযোগিতা করছে এবং যারা পেছনে থেকে সেই ব্যবসাকে জিইয়ে রেখেছে, তাদের সবার কঠিন সাজা হাওয়া উচিত। যাতে কেউ আর এই নিষিদ্ধ ব্যবসায় আসতে না পারে।